পুস্তক পর্যালোচনাঃ তেরিজা হাইতার এর ‘বিশ্ব দরিদ্র সৃষ্টি’ ১ম খন্ডের ২য় পর্ব

african-slum1-1

(llbangla.org)

আজকের বিশ্বে স্পস্ট একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে ধনি ও গরীব দেশ সমূহের মাঝে বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। বিশ্বের এই ব্যবধানকে সধারনত প্রথম বিশ্ব বনাম তৃতীয় বিশ্ব হিসাবে অবিহিত করা হয়। বিশ্ব শহর ও বিশ্ব গ্রাম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। পশ্চিম বনাম পূর্ব  এবং উত্তর বনাম দক্ষিন হিসেবে ও দেখা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়  বিশ্ব যুদ্বের পর থেকেই দুই অঞ্চলের মানুষের মাঝে ব্যাপক হারে সম্পদের ব্যবধান বাড়তে থাকে। যা আজকের দুনিয়ায় প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখা দিয়েছে। ১৯৮১ সালে প্রথম বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে তেরিজা হাইতা ‘বিশ্ব দারিদ্র সৃষ্টি’ সংক্রান্ত বইটি লিখেন ও প্রকাশ করেন। সেই পুস্তকে তিনি বিস্তারিত ভাবে বিশ্বের ধনী ও দরিদ্রের বিভক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। হাইতার তার পুস্তকের বিরাট অংশ জোড়ে রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ব পরবর্তী পরিস্থিতি ও ব্যাখ্যা করেন। তার বিবরনে মাওবাদি চিন্তাধারা ও তৃতীয় বিশ্ববাদি ভাবধারার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। যদিও তিনি তার পুস্তক রচনার সময়ে কোন কোন সময় হতাশ হয়েছেন তবু তিনি সত্যের মুখোমুখী হতে সরে যান নাই। তার লিখায় তৃতীয় বিশ্ববাদের দর্শনের প্রতিফলন দেখা গেছে। হাইতারের এই পুস্তকটি তৃতীয় বিশ্ববাদি অন্যান্য লিখকের পুস্তকের সম মর্যাদায় উন্নিত হয়েছে। তার বইটি এন্ড্রো গান্ডার ফ্রাঙ্ক এবং সামির আমীনের লিখার প্রায় সমমানের । ইহা সত্যিই একটি চমৎকার  অর্থনীতির পুস্তক।

প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের মাঝে ব্যবধান

তার পুস্তকটি ১৯৮১ সালে প্রথম প্রকাশিত হলে ও পরে ১৯৯০ সালে তা আবার প্রকাশিত হয়। তিনি তার বইয়ে  বিশ্ব পরিস্থিতির যে বর্ননা দেন তা এখন ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তীত থাকলেও সকল ক্ষেত্রে তা এখন আর যথার্থ নয়ঃ

“ ভৌগলিক ভাবে উত্তর প্রান্তের এলাকায় পূর্ব ইউরূপ অঞ্চলে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ লোক এবং পাঁচ ভাগের চার ভাগ আয়; দক্ষিন প্রান্তে চীন সহ চার বিলিয়ন মানুষের বাস – যা পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ, তাদের আয়ের পরিমান হলো পৃথিবীর মোট আয়ের পাঁচ ভাগের মাত্র এক ভাগ”। (১)

“ মজুরীর পরিমান উন্নয়নশীল দেশের মানুষ ধনী দেশের তুলনায় একই রকম কাজের জন্য সাধারনত ১৩ ভাগ থেকে ২১ ভাগ পর্যন্ত কম মজুরী পেয়ে থাকে”।(২)

“ বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৭৫ সালের হিসাব মতে শিল্প প্রধান ১৮ টি দেশের স্বাক্ষরতার গড় হার হলো ৯৯% ; পক্ষান্তরে নিম্ন আয়ের ৩৮ দেশে শিক্ষার হার ৩৮% এর নিচে অবস্থান করছে। ১৯৭৮ সালের এক হিসাবে দেখা যায় যে, শিল্প প্রধান ১৮ টি দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৪ বছর আর নিম্ন আয়ের দেশের মানুষের গড় আয়ু ৫০ বছর। ১৯৭৭ সালের হিসাব অনুসারে বিদ্যালয়ে অধ্য্যনরত ছাত্র ছাত্রীদের যতাক্রমে সংখ্যা ৮৭ % এবং ২৪%। একেই সময়ে দৈনিক ক্যালরী গ্রহনের পরিমান ছিলো যথাক্রমে, ৩,৩৭৭ এবং ২,০৫২ । আর জনসংখ্যা অনুপাতে, ৬৩০ জনে এক জন এবং ৯৯০০ জনে একজন করে ডাক্তার নির্ধারিত ছিলো। শক্তি ব্যবহারের পরিমান যথাক্রমে ৭,০৬০ এবং মাত্র ১৬১ কেজি কয়লার সম পরিমান ব্যবহার করা হচ্ছিল”। (৩)

উক্ত অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে ১৯৮১ সালে। ২০১০ সালে এসে প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের মাঝে সম্পদের ব্যবধান আরো ব্যাপক হারে বৃদ্বি পেয়েছে। উদাহরন হিসাবে উল্লেখ্য যে, দুনিয়া জোড়ে মধ্যম আয়ের হার হলো ২.৫০ ডলার। পক্ষান্তরে, আমেরিকায় যাদের বয়স পনর বছরের নিচে তাদের আয় হলো ( কর্ম রত ও বেকার) সকলের জন্যই ১১৯ ডলার। এখানে উল্লেখ্য যে ভারতে একজন মানুষ মাত্র ০.৮০ ডলার আয় করে। এই লোক সংখ্যা প্রায় আমেরিকার লোক সংখ্যার সমান। এতে প্রমানিত হয় যে ভারোতীয়দের ঠিকে থাকার জন্য আমেরিকানদের তুলনায় অধিক হারে কাজ করতে হয়। (৪) কিন্তু তাদের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন দেখা যায় না । উদাহরন হিসাবে আমরা দেখি যে ভারতে গত বছরে ও ১০০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার্থ অবস্থায় দিনাতিপাত করেছেন। তৃতীয় বিশ্বে এই ক্ষুধার্থ মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। জাতি সংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছরেও ১১% অনাহারী মানুষের পরিমান বৃদ্বি পেয়েছে।  দুনিয়ায় অনাহারী মানুষের হার বেড়ে ১.০২% বিলিয়ন হতে চলেছে। (৫) হাইথার তাঁর বইটি লিখার সময়ে এই পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছিলো। তাঁর মন্তব্য ছিলো সারা বিশ্বে অভাবী মানুষের পরিমান প্রায় ৭০০ মিলিয়ন। এর মধ্যে সৌভিয়েত বাদে কেবল উন্নয়নশীল দেশ সমূহেই আছে ৪০% অভাবী মানুষ। (৬)

“ কিছু দেশ এখন ও আছে যেখানে প্রতি ৪ জন শিশুর মধ্যে ১ জন তাঁর ৫ম জন্ম বার্ষিকী পালনের আগেই মারা যায়। এখনও মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ মাটির ঘর, খুপরি ঘর ও নানা জাতীয় পন্যের বাক্সে বসবাস করে থাকেন। তাদের খাবারের জন্য নিরাপদ পানি ও পায়খানার ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই। বিদ্যুৎ তাদের জন্য একটি বিলাশের বিষয়। স্বাস্থ্য সেবার তেমন কোন ব্যবস্থা ও তাদের জন্য নেই। আই এল ও এর হিসাবে অনুসারে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষ আছেন যাদের জন্য বেকার ভাতার বা রোজগারের নিয়মিত কোন ব্যবস্থা আজো হয়নি। তাদের জন্য দরকষাকষির কোন সংগঠন বা সমিতি ও নেই। ফলে নানা ভাবে তাঁরা নিগৃহিত হয়ে থাকেন”। (৭)

দুনিয়ায় হত দরিদ্র, ও নিপিড়িত মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলছে। তেরিজার এই বইটি যখন প্রকাশিত হয় তখন বিশ্ব জনসংখ্যার মধ্যে একটা ব্যাপক ভিত্তিক পরিবর্তন চলছে। এটা দুনিয়ার ইতিহাসে প্রথম ঘটনা যে, এখন মানব জাতির মধ্যে বেশীর ভাগ মানুষ শহরে বসবাস করছেন। তবে, নগর বাসী মানুষের জীবন যাত্রা সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রবক্তারা ও তেমন কোন নির্দেশনা দিতে পারেননি। নগরায়ন ও শহরায়নের ফলে নানা জায়গায় গড়ে উঠছে বিশাল বিশাল মানব বস্তী। সেই বস্তীবাসী লোকেরা মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন। সেই জনশক্তিকে সত্যিকার ভাবে উৎপাদনে ও কাজে লাগানো যাচ্ছে না । এঁরা কর্মহীন ও বেকার থেকেই যাচ্ছে। অথচ এঁদেরকে শিল্পে ব্যাপক ভাবে কাজে লাগানো যেত। কার্ল মার্ক্সের মতে, এঁদেরকে শিল্প সৈনিকে পরিণত করা যেত। তাদের বেঁচে থাকার জন্য খরচ তো হচ্ছেই । তা যেভাবেই হোক। তবে পুঁজিবাদ তাদের কেঊ কেঊ কে কেবল নিজেদের স্বার্থেই ব্যবহার করছেন। বস্তীর লোকেরা বেচে থাকার জন্যই কাজের জন্য শ্রম বাজের এসে ভীর করছেন। সেই সুযোগে পুঁজিবাদ তাদেরকে মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছেন। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ নানা স্তরে এই অবস্থার সম্মোখিন হচ্ছেন। বস্তীবাসী মানুষের আধ্যিক্যের কারনে তৃতীয় বিশ্বে শিল্পায়নের গতি বৃদ্বি হয়েছে। পক্ষান্তরে, প্রথম বিশ্বে শিল্পায়নের হার দিনে দিনে কমছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরিত হয়ে প্রথম বিশ্ব থেকে তৃতীয় বিশ্বে চলে আসছে। বস্তীর লোকেরা  অলসতার বদলে স্বল্প মজুরীতে কাজে নেমেছে এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছেন। বস্তীবাসীর সংখ্যা বাড়ছে, শিল্প শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে । এটা দেখে সাম্রাজ্যবাদ আবার তাদের নিরাপত্তার জন্য চিন্তিত ও হয়ে পড়েছে। তাদের আশংকা হলো সেই বস্তীবাসী তৃতীয় বিশ্বের মানুষ আবার কোন দিন জন সংগ্রামের সূচনা করে বসে কি না।

হাইতার যেভাবে বিশ্ব জন সংখ্যার চিত্র চিত্রায়ন করেছেন তাতে দেখা যায় যে, বিগত দুই দশক যাবত প্রথম বিশ্ববাদি মানুষেরা প্রথম বিশ্বের লোকদেরকে সম্পূর্ন আলাদা ভাবে বিবেচনা করে আসছেন। তাঁরা সত্যিকার ভাবে ধনী দেশ ও গরীব দেশ সমূহের মাঝে যে পরিমান অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃজন হয়েছে তা ও তাঁরা বুঝতে পারেন নাই। একে অন্যের সাথে কিভাবে সম্পর্ক নির্নয় করা হবে তা ও তাঁরা বুঝতে সক্ষম নন। তাঁরা একটি দেশের ভেতরকার পরিস্থিতি ও বিশ্ব পরিস্থতির মাঝে মেলবন্দ্বনের বিষয়টি ও বুঝেন নাই। প্রথম বিশ্ববাদি চক্র হল সাম্রাজ্যবাদী ও সুভিনিস্ট প্রকৃতির চিন্তার ধারক।

ঐতিহাসিক বৈষম্য

হাইতার তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, সমাজের বৈশম্য সম্পর্কে বুর্জোয়াদের প্রদত্ত্ব ব্যাখ্যা হলো একটি অসার কথার ফুলঝুরি। সেই ব্যাখ্যা হলো জাতিগত ও সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর অনুমান মাত্রঃ তাদের মতে বৈশম্য হলো প্রকৃতিগত ভাবেই ইউরূপীয়রা শ্রেস্ট জাতি; তাঁরা বলেন, আবহাওয়াও একটি বড় কারন, গরম আবহাওয়া মানুষকে অলস বানিয়ে দেয়; এ ছাড়া প্রট্যাস্টান নৈতিকতা   ইউরূপ ও উত্তর আমেরিকাকে উজ্জিবিত করেছে ইত্যাদি।  এই ধরনের ব্যাখ্যা প্রথম বিশ্ববাদি ও জাতীগর্বী চক্র হাজির করে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য হলো প্রথম বিশ্বের শ্রমিক শ্রেনীর উচ্চ আয় ও সেখানকার জনগণের উন্নত জীবনের প্রাপ্যতা জায়েজ করার প্রায়স। তাদের মতে এটাই যথার্থ এবং স্বাভাবিক। হাইতার বলেন এই সকল বিষয় মুলত বাস্তবতা ও ইতিহাস নির্ভর পরিস্থিতি। এই ধরনের অসার সমাজ ও ইতিহাস বিশ্লেষণ এবং বিশ্ব বৈশম্য কেবল জাতিগর্বী ও সাম্রাজ্যবাদী সংকির্ন লোকেরাই গ্রহন করতে পারেন। তা কোন বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ গ্রহন করতে পারেন না ।

হাইতার বলেন, ইউরূপীয়রা তো অনেক পড়ে দুনিয়ার মানচিত্রে আভির্ভূত হয়েছেন। আমরা মার্কো পলোর গবেষণা থেকে জানতে পারি যে, সেই সময়কার চীন ইউরূপের চেয়ে কত অগ্রসর ছিলো। ১৭৯৩ সালে চীনের সম্রাট ঘোষনা করেছিলেন  এবং ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় জর্জকে জানিয়েছিলেন যে,  চীন যে পরিমান পন্য দ্রব্য উৎপাদন করেন তা তাদের জন্য যতেস্ট, তাদের জন্য কোন প্রকার ইংলিশ পন্যের দরকার নেই। ১৪৯৮ সালে ভারতের রাজা মালাবার পুর্তোগালের রাজাকে একই রকমের বার্তা প্রেরন করেছিলেন। সেই সময়ে ইউরূপ কোন ভাবেই অন্যদের চেয়ে অগ্রসর ছিলো না । পরবর্তীতে ইউরূপ ও উত্তর আমেরিকা সারা দুনিয়া থেকে ছলেবলে কৌশলে সম্পদ স্তূপীকৃত করে এবং  সম্প্রতি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটিয়েছে। উনিশ শতকে ব্রিটিশরা ও অন্যান্য ইউরূপীয় দেশ সমূহ শিল্প বিপ্লব সাধন করেছেন, এরপর আমেরিকা ও পরে জাপান তার উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করেছে। তেরিজা হাইতার উল্লেখ করেন যে, এই প্রসঙ্গে ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের মতে এঁরা হলো বুর্জোয়া কর্মজীবী শ্রেনী ও লিনেনের ভাষায় এঁরা হলো অভিজাত শ্রমজিবী মানুষঃ

“ বিংশ শতাব্দির সূচনা লগ্নেই ইউরূপের শ্রমজীবী মানুষের জীবন যাত্রা উন্নত হতে শুরু করে.. কিন্তু এর ফলে  ইউরূপ ও উত্তর অ্যামেরিকার সেই  অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন ক্রমে দূর্বল  হতে শুরু করে। তাঁরা নিজেদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করার শক্তি হারাতে থাকে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, উনিশ শতকের চেয়ে এখন তাদের জীবন যাত্রার মান বৃদ্বি পেয়েছে। তা কেবল শ্রমিকদের জন্য নয় কৃষকের অবস্থার ও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে”। (৮)

বিশ্ব পরিস্থিতিতে পশ্চিমা দুনিয়ার এই পরিবর্তনের জন্য হাইতার অনেক গুলো বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। পাঁচ শতাব্দি আগে ইউরূপ দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা ব্যবসা, লুন্ঠন, দাসত্ব, দাসুত্ব ব্যবসা, জলে স্থলে ডাকাতি করেছে। “ নতুন দুনিয়া” গড়েছে ইউরূপ। “মুক্ত বানিজ্যের” নামে ওরা কেবল লুন্ঠন চালিয়েছে সর্বত্র। সারা দুনিয়া থেকে আহরিত ও লুন্ঠিত অর্থ তাদের  প্রথমিক পুঁজি গঠনে সহায়তা করে । যা পরবর্তীতে সেখানে পুঁজিবাদের বিকাশে বিরাট ভূমিকা রাখে। এছাড়া পুঁজিবাদের ভাব ধারায় পরিচালিত ইউরূপের অর্থনীতি লুন্ঠিত অর্থের সংযোগে গতিশীল হয়ে সারা দুনিয়ায় প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখে।

যে সকল দেশ প্রথমে পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করেছে, তাঁরা প্রথমেই কিছু বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। তবে, যদি ও স্পেন আজটেক ও ইনকা সবভ্যতা লুণ্ঠন করে বিপুল সম্পদ আহরন করেছিলো কিন্তু পুঁজিবাদের যথাযথ বিকাশ না ঘটাতে পারার করানে তেমন সুবিধা করতে পারে নাই। হাইতার বলেন উনিশ শতকে ব্রিটেনে পুঁজিবাদের পুর্ন বিকাশ ঘটে। তবে তাঁরা শোড়ষ শতাব্দিতেই কারখানা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করেছিলো। সেই ব্রিটেন সতর শতক ও আটার শতকে তাদের কৃষিকে পুঁজিবাদের আওতায় নিয়ে আসে। পজিবাদ সেখানে ব্যাপক হারে কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে সামনের দিকে নিয়ে যায়। তাদের উৎপাদন হয়ে উঠে সামাজিক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক।  তাদের অলসতা বিদূরিত হয়, এবং পরিস্থিতি এমন হয় যে, ইচ্ছার বিরুদ্বে ও তাঁরা কাজ করতে চেষ্টা করে। তাদের উৎপাদন ও পন্যের সমাহার ব্যাপক আকার ধারন করার কারনে সস্তায় দ্রব্যাদি কিনতে ও পারছেন। পুঁজিবাদ উৎপাদন কারীদের দক্ষতা বৃদ্বিতে ও সহায়তা করে। (৯) হাইতার তার ব্যাখ্যায় দেখিয়ে দেন যে, পুঁজিবাদ এক নতুন দুনিয়ার সৃজন করে ফেলেছে। এর সাথে রবার্ট ব্রিনার এবং এলিন মাইকসন উড একমত পোষন করে বলেন যে এই শিল্পায়নের শিকর ব্রিটেনের কৃষি কাজের মাঝে ও নিহিত আছে।

তেরিজা হাইতার এর পুস্তকটি সত্যি একটি চমৎকার গবেষণা মূলক বই যাতে আধুনিক দুনিয়ার রাষ্ট্র সমূহের মাঝে পারস্পরিক বৈষম্য ফুটে উঠেছে। হাইতার যদি ও নানা সময় তৃতীয় বিশ্ববাদের গুরুত্ব দেন নাই কিন্তু তার পুস্তকে প্রধানত তৃতীয় বিশ্ববাদের বক্তব্যই উপস্থাপিত হয়েছে। সত্যিকার ভাবে বিবেচনা করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারব যে, চলমান দুনিয়ায় যে বৈশম্য বিদ্যমান আছে তা কোন ভাবেই প্রকৃতিক বিষয় নয়। হেইতার নিজেই এক দির্ঘ ইতিহাস পর্যালোচোনা করে তা দুনিয়া বাসীর কাছে হাজির করেছেন। প্রথম বিশ্বের দ্রুত এগিয়ে যাওয়া আর তৃতীয় বিশ্বের পিছনে পরে থাকার মাঝে কোন প্রকার রহস্য লুকিয়ে নেই। ইউরূপীয় দেশ ও অন্যান্য প্রথম বিশ্বের দেশ সমূহের ব্যাপক উন্নয়ন তৃতীয় বিশ্বের পিছিয়ে থাকার উপর নির্ভরশীল। হাইতারের বই ‘ বিশ্ব দরিদ্র সৃষ্টি’ আমাদের সামনে দরিদ্রতা সংক্রান্ত নানা জটিলতার প্রকাশ করেছে। তার বইটি নির্ভরতার তত্ত্ব ও অসমতার তত্ত্ব সহজ ভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।  দুনিয়া সম্পর্কে ভালভাবে জ্ঞান অর্জন করতে পারলে দুনিয়াকে বদল করা ও সহজ হয়। যদি তৃতীয় বিশ্বের সর্বহারা শ্রেনীর মানুষ তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সফল হতে চায়, তবে তাদেরকে অত্যন্ত প্রাগ্রসর বিজ্ঞানের অনুসারী হতে হবে। বিজ্ঞান  ছাড়া দুনিয়ার বদল সম্ভব নয়। বিজ্ঞানই হলো আজকের মানুষের সামনে মুক্তির দিশা।
সূত্রঃ

1. Hayter, Teresa. The Creation of World Poverty. Third World First. Great Britain: 1990. p. 16

2. Hayter, p. 18

3. Hayter, pp. 17-18

4. Amerikkkans rich, Indians poor, so-called “ICM” deaf and dumb. Monkey Smashes Heaven. August 19, 2007. http://monkeysmashesheaven.wordpress.com/2007/08/19/amerikkkans-rich-indians-poor-so-called-icm-deaf-and-dumb/


5. One billion go hungry.. socialism is better than capitalism. Monkey Smashes Heaven. June 28, 2009. http://monkeysmashesheaven.wordpress.com/2009/06/28/one-billion-go-hungry-socialism-is-better-than-capitalism/
6. Hayter, p. 18
7. Hayter, p. 18
8. Hayter, pp. 27-29

Advertisements