শোষন ও সামাজিক সঞ্চালনের উপর দুইটি প্রশ্ন

শোষন ও সামাজিক সঞ্চালনের উপর দুইটি প্রশ্ন
একজন পাঠক জানতে চাইলেনঃ
“ আমার দুইটি প্রশ্ন আছে। আপনাকে বিরক্ত করা বা উত্তেজিত করার জন্য নয় কেবল জানার জন্যই আমার জিজ্ঞাসা।
১। লিডিং লাইটের তত্ত্বানুসারে প্রথম বিশ্বের শ্রমিক শ্রেনী কি বিশ্ব পুঁজিবাদের চলমান প্রবনতাকে উপেক্ষা করছেন, যা না হলে শ্রমিকেদের বঞ্চনাকে দূর করতে পারত? তারা কি তৃতীয় বিশ্বের প্রলেতারিয়েতদের জন্য যে বস্তুগত সহায়তা দরকার যা তাদের আন্দোলন সংগ্রামের জন্য আবশ্যক তা দিতে উপেক্ষা করছেন?
২। তত্ত্বগত ভাবে, আমি যদি বিশ্ব গড় মজুরির কম পাই, আর পরবর্তীতে কিছু বেশী পাই, তবে কি আমি ক্রমে অভিজাত শ্রমিকে পরিনত হব? যদি তা না হয় তবে তবে আমার মজুরির গড় কত পর্যন্ত হতে পারে”?
প্রেইরী ফায়ারের জবাবঃ
প্রশ্ন করা কোন অন্যায় কর্ম নয়। বুদ্বিমান লোকেরা প্রশ্ন করবেন এটাই স্বাভাবিক।
১। কমিউনিস্ট ইশতেহারে কার্ল মার্কস যে ভাবে পুঁজিবাদ বিষয়ে ভবিষ্যৎ বানী করেছিলেন বাস্তবে তা ঘটেনি। বিশ্ব প্রধান “দুইটি বড় শ্রেনীতে” মজুর ও বুর্জয়ায় বিভাজন ঘটেনি । বরং মার্কসের সময়ের চেয়ে এখন শ্রেনী অনেক জটিল রূপ ধারন করেছে। মার্কস তার গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষনায় ও বিষয়টিকে সরল ভাবে দেখেন নাই। পরবর্তীতে মার্কসবাদি চিন্তাবিদগণ অধিক চিন্তা ভাবনা করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির বর্ননা করেছেন। বিজ্ঞানের উন্নয়ন হয়েছে।
পুঁজিবাদের “বড় প্রবনতা” হলো শ্রমিকদের বঞ্চিত জন গুষ্টিতে পরিনত করা – এই কথাটির ভিত্তি কি ? এমন কি এঙ্গেলস যখন বুর্জোয়া করন প্রক্রিয়ার উপর লিখা শুরু করেন তখন ও ব্যাপক সংখ্যক মানুষ শ্রমজীবী ছিলেন। সেই সময়েই এঙ্গেলস বললেন, সমগ্র জাতিই বুর্জোয়া করন হয়ে গেছে। লেনিনের সময়ে, বলশেভিকগণ বলতে শুরু করেছিলেন “ অভিজাত শ্রমিক শ্রেনী” র কথা। লেনিনের বিখ্যাত একটি উক্তি আছে, “ পরগাছাবাদ নির্মূল করুন” ইহা সমগ্র জাতিকে দূষিত করে দিবে। চীনের লিন পিয়াং মন্তব্য করেছিলেন, প্রথম বিশ্বের প্রলেতারিয়েতের লড়াই “দেরীতে” হবে। অন্যান্য অঞ্চলে জোরদার হবার আগে শক্তিশালী হবে না । স্বয়ং লেনিন ও স্বীকার করেছিলেন সকল শ্রমিকদেরকে সরল ভাবে এক পাল্লায় বিবেচনা করা সমিচীন নয় – একেই ভাবে লিন পিয়াং ও তাদের মাঝে পার্থক্য রেখা টানতে গিয়ে বলেছিলেন বিশ্ব গ্রাম ও বিশ্ব নগর। লেনিন একে বলতেন, “ শ্রমিক শ্রেনীর বিভাজন”। বিপ্লবী কার্যক্রমের ইতিহাসে ও সকল শ্রমিক শ্রেনীকে এক ভাবে দেখা হয়নি। এমন কি আমাদের সামনে যে বিশ্ব আমরা দেখছি তা ও কিন্তু সমতল নয়।
এঙ্গেলস এবং লেনিন বুর্জোয়াকরন প্রক্রিয়াটি বৃদ্বি পাচ্ছে তা স্বীকার করে গেছেন, শ্রমজীবী মানুষের মাঝে বিভাজন বাড়ছে এবং তা বেড়েই চলেছে। তাদের এই মতামত ও প্রায় ১০০ বছর আগেরকার কথা। তাদের সময়ে যে প্রবনতা বৃদ্বি পাচ্ছিল সেই প্রবনতা এখন বিগত এক শতাব্দি ধরে ব্যাপক ঢাল-পালা চড়িয়েছে। আজ প্রথম বিশ্বে সত্যিকার অর্থে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রলেতারিয়েত নেই, তাই এখানে বিপ্লবী শ্রেনী ও শক্তি নেই। এখান কার শ্রমজীবী মানুষ এখন বিশ্ব বুর্জোয়ারই অংশে পরিনত হয়েছে, বা অভিজাত শ্রমিতে পরিনত হয়েছে। বর্তমানে, বিশ্ব সামাজিক উৎপাদনের গড়ের চেয়ে অনেক বেশী পায় একজন মার্কিন শ্রমিক। তা হলে তারা কেন প্রচলিত ব্যবস্থার উচ্ছেদ চাইবেন বা বিশ্ব সাম্যের পথে এগিয়ে আসবেন? সমবন্ঠন কেন চাইবেন? তারা তা অবশ্যই চাইবেন না। তারা তা চাইছেনও না। প্রথম বিশ্বের শ্রমিক ও তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিক কোন ভাবেই একেই শ্রেনীভুক্ত নন।
পুঁজিবাদের সাধারন প্রবণতা হিসাবে ও যদি নিম্ন মজুরির আলোকে চিন্তা করা হয় তবু ও একথা বলা যায় না যে, মার্কিন শ্রমিক বা প্রথম বিশ্বের শ্রমিক প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর অন্তর্ভুক্ত। যদি বলা হয় যে, বিগত ১০০ বছর সেখানকার শ্রমিক শ্রেনী শোষণের শিকার হয়েছে বলেই তারা প্রচলিত ব্যবস্থার অবসান চান। বা কিছু বুর্জয়া মন্দার কারনে শ্রমিকে পরিনত হয়ে বিপ্লবী হয়ে উঠবেন। এসকল কথা বিবেচনা করলেও আমরা বলতে পারিনা যে, উক্ত শ্রেনীভুক্ত লোকেরা প্রলেতারিয়েত। পুঁজিবাদ একটি অস্থিতিশীল ব্যবস্থা। মার্কস একে নৈরাজ্যবাদ বলেছেন। এখানে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। সমস্যা ডেকে আনা পুঁজিবাদের ধর্ম। আসল কথা হলো, আমরা যদি বর্তমান বিশ্ব শ্রেনীকে বিবেচনা করি, তবে দেখব এক শতাব্দি আগে এটা কেমন ছিলো আর এখন কি রূপ ধারন করেছে। মানুষ তার নিজস্ব শ্রেনী স্বার্থে স্ব স্ব কাজ করে যাচ্ছেন। তারা কিন্তু ভবিষ্যৎ শ্রেনী নিয়ে কাজ করেন না। ১০০ বছর পর কে কোন শ্রেনী ভুক্ত হবেন তা নিয়ে কাজ করেন না।
২। আজকের বিশ্ব অর্থনীতি মূলত একটি বিশাল ও অবিভক্ত ছাতায় আবৃত। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া বিগত প্রায় একশত বছর ধরেই চলছে। কতিপয় আদিবাসী যেমন আমাজান ইত্যাদি ছাড়া মূলত সকলেই কোন না কোন ভাবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে আছে। এবং বিশ্ব উৎপাদন ব্যবস্থায় ও একটি নিয়ন্ত্রন রেখা টানা আছে। বিশ্ব অর্থনীতি প্রতি বছর একটি সীমিত মূল্য ও সংযোজন করে থাকে। এই পরিস্থিতিতে কেহ যদি কিছু বেশী পায় তবে অন্যরা কিছু কম পাবেন এটাই স্বাভাবিক বিষয়। বিশ্ব অর্থনীতি আসলে একটি নদীর মতই বয়ে চলেছে। এক দিকে শ্রুত বেশী হলে অন্য দিকে কিছু কমবেই। মানুষ এই শ্রুত ধারা থেকে তাদের ক্ষমতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান এবং লিংগগত পরিচয় থেকে নিজ নিজ ফায়দা হাসিল করে চলেছে।
এখন , আমরা কয়েকটি দিক থেকে শোষন প্রক্রিয়াকে দেখতে পারি। এর একটি গুরুত্বপূর্ন দিক হলো শ্রমের সাথে শোষণের একটি বিশাল সম্পর্ক বিদ্যমান। ইহা মূল্য তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত আছে। এই ক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হয় এই ভাবে যে, একজন কমরেড জনগণের সেবক হিসাবে বিশ্ব উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রাপ্ত অতিরিক্ত মুনাফা অন্যন্য শ্রমিকদের সাথে ভাগাভাগী করে নিবেন। আমাদের জিজ্ঞাসা হতে পারেঃ কারা বেশী উৎপাদন করেন আর কারা কম করেন। প্রকল্প অনুসারে, যারা বেশী উৎপাদন করেন তারা বেশী পায় না, যারা কম উৎপাদন করেন তারা বেশী গ্রহন করেন। তাই, তাদেরকেই শোষক বলা যায় । তারা যদি কাজে নিয়োজিত থাকেন তবে তাদেরকে আমরা বলতে পারি অভিজাত শ্রমিক। যারা কম করেন তারা শোষণের শিকার হন। এই পদ্বতির কিছু দূর্বলতা রয়েছে। এতে তৃতীয় বিশ্বে কর্মহীন ও অনুতপাদনশীল দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্বি পায়।
পুজিবাদে শোষনকে অন্য ভাবেও দেখা যায় । যেমন, বিশ্ব উদ্ভৃত্ত্ব অর্থকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে বিতরনের করার ক্ষেত্রে। সমাজতন্ত্র হলো সম বিতরন বিষয়ক, আমরা সম বিতরনের নীতিকে একটি আইন হিসাবে বিবেচনায় আনতে পারি। যারা সামাজিক উৎপাদনের স্বাভাবিক পাওনার চেয়ে বেশী গ্রহন করেন তারা হলেন শোষক। যারা কম পান তারা হলেন শোষিত শ্রেনী। উক্ত দুই টি সূত্রানুসারে প্রথম বিশ্বের শ্রমিকগন কোন ভাবেই শোষিত নন। তারা সত্যিকার অর্থে শোষক। আমরা যদি বিশেষ ভাবে বিশ্ব উদ্ভৃত্ত্ব অর্থের দিকে দৃস্টি দেই তবে দেখতে পাব প্রথম বিশ্বের বিশ্ব বিতরনের কত বেশী সুবিধা অর্জন করছেন। একজন প্রথম বিশ্বের শ্রমিক যত সুন্দর ও আরামদায়ক ভাবে অবসর কাটায় অন্য দিকে তৃতীয় বিশ্বের একজন শ্রমিক এখনও তা স্বপ্নে ও ভাবতে পারেন না। প্রথম বিশ্বের শ্রমিক জীবনের সকল প্রকার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ভোগ করতে পারেন। তা একজন তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিকের সম্পূর্ন নাগালের বাইরে। বিশ্ব বিতরন ব্যবস্থায় পাহাড় সম বৈশম্য বিদ্যমান।
মানুষের সামগ্রীক আচার ব্যবহার প্রধানত তার শ্রেনী, জাতি, ও লিংগগত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। ইহাকেই মার্কসের ভাষায় বলা হয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। তবে, মানুষ কিন্তু সুনির্দিস্ট ভাবে বিভক্ত নয়। বরং তা কিন্তু একটি ধূয়াশা অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। জনগণের মধ্যে কেহ আজ শোষক হলে কাল তিনি হয়ত আবার শোষিত হচ্ছেন। কেহ হয়ত নিজেকে বঞ্চিত ভাবছেন আবার হয়ত তা তিনি ভিন্ন ভাবনায় দোলছেন। কোন কোন সময় এই চিন্তার মানুষের সংখ্যা বেড়ে ও যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে আমরা তাকে “প্রলেতারিয়ান স্মৃতি হিসাবে” বিবেচনা করতে পারি। এখানে উদাহরন হিসাবে আমরা উত্তর আইয়ার ল্যান্ডের কথা বলতে পারি। সেখানে যদি ও উল্লেখ যোগ্য ভাবে কোন প্রলেতারিয়েত নেই এবং ইহা প্রথম বিশ্বের অংশ। তাদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক মাত্রায় আন্তর্জাতিকতাবাদ। কিন্তু জাতিয়তাবাদি শোষণের কারনে তারা ও বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতি ঝোঁকে ছিলো। কিন্তু পরে তা সময়ের ব্যবধানে তিরুহিত হয়ে পরে। সময়ের সাথে সাথে তাদের উপর শোষণের মাত্রা কমতে থাকে। ক্রমে এরা বুর্জোয়াকরনের আওতায় চলে আসে। তাদের মধ্যথেকে প্রলেতারিয়ান ভাবনা বিলিন হয়ে যায়। এই ধরনের ঘটনা আমরা সারা দুনিয়ায় অহরহ দেখতে পাবো। একটি বহুজাতিক কোম্পানী তার বিরুদ্বে সমালোচনা মোকাবেলার জন্য একজন কালো মানুষকে উঁচু পদে চাকুরী দিয়ে দিতে পারে। এই নতুন নিয়োগ প্রাপ্ত কালো মানুষটি উঁচু বেতন পেয়ে সম্পদ শালী হয়ে উঠবেন, ফলে তার দৃস্টিভঙ্গীতে ও পরিবর্তন ঘটবে। তিনি তার চারি পার্শ্বের লোকদের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করে মানসিক ভাবে বদলে যাবেন। তিনি “বিক্রি হয়ে” হয়ে যাবেন। আমরা সঙ্গীতের জগতে তা প্রায়স দেখছি। যদি সেটা ভিন্ন ভাবে কাজ করে। কেহ যদি শোষকের জায়গা থেকে শোষিতের জায়গায় চলে আসেন তবে কিছু দিন ধরে রাখার চেষ্টা করেন। সময়ের ব্যবধানে তার মধ্যে ও পরিবর্তন ঘটে। তিনি ও এক সময় বুঝতে পারেন যে তার সত্যিকার বন্দু ও শত্রু কে বা তার কি করা দরকার তখন তার লক্ষ্য হয় “ শৃংখল মক্তি ছাড়া তাদের আর কিছু থাকে না” । যা মার্কস অনেক অগেই বুঝে দুনিয়ার মানুষকে বলে গেছেন।
জনগণ কোন সময়েই “নিজে নিজে” কিছু করেন না । দুনিয়া হলো একটি বৈচিত্রময় জায়গা। এখানে উইটিংস্টেইন এরিস্টেটলের চেয়ে বেশী সমাদৃত। বিশ্ব কিছুই পরিস্কার ভাবে সংজ্ঞায়িত করা নেই। এখানে নানা ধরনের ভুল বাল হয়ে থাকে তা আবার সংশোধন ও করা হয়। এখানে অনেক ধোঁয়াশা আছে। মাওসেতুং তাই খুবই গুরুত্বপূর্ন ও সাধারন প্রশ্ন করেছিলেন। কে বন্দ্বু আর কে ই বা শত্রু। বিপ্লবী কর্মের জন্য বন্দ্বুকে সাথে নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলা করা অতি দরকারী বিষয়। মাওয়ের এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে দুনিয়াকে আর্থ সামাজিক ভাবে দুই ভাগে ভাগ করতে হবে। দুনিয়াকে পরিবর্তনের জন্য আমাদেরকে তা অবশ্যই বুঝতে হবে। প্রথম বিশ্ব নিজেকে অঘোষিত ভাবে বিভক্ত করে রেখেছে। প্রথম বিশ্ববাদ বিষয়টি এখন ও অনেকের নিকট পরিস্কার নয়। লিডিং লাইট তার দলিল পত্রে সাধ্যমত ব্যাখ্যা হাজির করেছে। প্রথম বিশ্ববাদ সম্পর্কে ট্রটস্কীবাদ, মাওবাদ অন্যান্যরা যা বলছেন তা একেবারেই বিজ্ঞান বিত্তিক নয়। ইহা পরিস্কার ডগমা। এখন আলোকিত সাম্যবাদই হলো প্রাগ্রসর বিপ্লবী বিজ্ঞান। অনুবাদঃ এডভোকেট শিহাব

Advertisements