পুস্তক পর্যালোচনাঃ টার্নিং মানি ইনটু রিবিলিয়ন (তৃতীয় পর্ব), লিখক- গ্যাব্রিয়েল কুন

টার্নিং মানি ইনটু রিবিলিয়ন বা বিদ্রোহীদের নিকট অর্থ সঞ্চালনঃ এই পুস্তকের বিষয় বস্তু হলো মার্কসবাদি- বিপ্লবীদের দ্বারা ডেনমার্কের ব্যাংক লুট (কার্স্পলেবেদভ,২০১৪) করে তৃতীয় বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদি kuf_plakat-212x300আন্দোলনকে জোড়দার করতে অর্থ সঞ্চালন করা প্রসংগ। এরা প্রথম বিশ্বে নিজেদেরকে তথাকথিত “বাম” বলে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রয়াস চালায়। এই বইয়ে বিপ্লবীদের উত্থান জন্ম কথা তুলে ধরে গনমাধ্যমে “ব্লেকিংয়েজড গ্রুপ” হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। এটা মলত মাওবাদি একটি সংগঠন (কে এ কে), যা ১৯৬৩ সালে জন্ম লাভ করেছিলো। পরবর্তীতে এটায় ভাঙ্গন দেখা দেয়। এই পুস্তকে পরবর্তী দলের উপর বেশী আলোকপাত করা হয়। এই পস্তকে সকল গঠনা প্রবাহ, চিন্তাধারা ও প্রথম বিশ্বে যে এখন বিপ্লব করার উপাদান নেই তা চমৎকার ভাবে বর্ননা করা হয়েছে। তাই তারা মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীকার লড়াই সংগ্রামে বস্তুগত সহায়তা প্রদান করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। তারা শ্লোগান দেয়, “ সংহতি ও একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়- আপনি এতে অংশ নিন”।
সিনো-সোভিয়েত বিভক্তি
কে এ কে সত্যিকার অর্থে চীনের পক্ষ নিয়েছিলো। কিন্তু ১৯৬৮ সালের পর তারা চীনের সাথে সম্পর্ক চিন্ন করে ফেলে। প্রথম বিশ্বে বিপ্লবের প্রশ্নে চীনের অবস্থানকে তাদের মতে মারাত্মক ভূল ছিলো। চীন মনে করতে থাকে যে প্রথম বিশ্বেই বিপ্লব হবে এবং তা তারা তাদের নানা প্রকাশনা ও লিখনীতে প্রাকাশ করতে থাকে । কিন্তু কে এ কে সেই প্রশ্নে দ্বিমত পোষন করে। কে এ কে তাদের সামাজিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে হাজির করে। ১৯৭৮ সালে যখন কে এ কে ভেঙ্গে যায় তখন এরা আবার বেইজিং এর সাথে সম্পর্ক তৈরী করে নেয়। কিন্তু অপর অংশ তা থেকে বিরত থাকে । ১৯৭৮ সালের পর কে এ কে ডেনমার্কে চীনের মুখপাত্রে পরিনত হয়। এমন কি মাওয়ের মৃত্যুর পর চার খলিফা গ্রেফতারের পর ও তা অব্যাহত থাকে। চীনের বিপ্লবের পুনঃ গঠনের কাজ হাতে নেয়ার পর ও এরা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে চীনের পক্ষে সাম্যবাদি আন্দোলনের জন্য নেতৃত্ব দিতে থাকে । কিন্তু এম কে এ সে পথে হাটেনি। যদি ও এম- কে এ চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব স্থানীয় নীতিমালার প্রতি সহানুভূতীশীল ছিলো কিন্তু ১৯৭০ সালের পর থেকে চীনের বিদেশ নীতির প্রতি এম-কে এ দ্বিমত পোষণ করে আসছেঃ
“জেনঃ আদর্শগত ভাবে আমরা এক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই। আমরা চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতি আস্থাশীল থাকতে পারছিলাম না । আমাদের মনে হয়নি এই উদ্যোগ সাম্যবাদের পক্ষে। চীন মানুষের স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতি সমর্থক থাকছিলো না । পক্ষান্তরে, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের নিজেদের স্বার্থেই স্বাধীকার আন্দোলনের সমর্থন দিচ্ছিলো। তারা তাদের সাফল্য ও সমাজতন্ত্রের সম্প্রসারন চাইছিলো। তারা তীক্ষ্ণ বিচার বিবেচনা করে তাদের পক্ষে নেতা নির্বাচন করছিলেন। তাদের নিতিমালার সাথে আমাদের নীতিমালার মিল ছিলোঃ তারা জন সমর্থন ভিত্তিক সমাতান্ত্রিক পার্টিকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে চীনারা এর মারাত্মক বিরুধীতায় নামে। চীন ইগোইজমের প্রভাবে যাকে থাকে সমর্থন দিতে থাকে । এমন কি এরা প্রবল শত্রুকে ও সমর্থন জানায়। উদাহরন হিসাবে এংগোলার ইউনিতার কথা বলা যায়। এরা মুলত সি আই এর সংগঠন চীন তাদেরকে সমর্থন দিয়ে বসে।
টুর্কিলঃ ১৯৭০ সালের শেষের দিকে এবং ১৯৮০ সালের সূচনায় চীন বলতে লাগলো সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে অধিক বিপদজনক, এরা পাশ্চাত্যের সাথে মিশে আমেরিকার সাথে এক জোট হয়ে স্বাধিকার আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে সাহাজ্য করছে। তাদের কথা গুলো সত্যিই হাস্যকর ছিলো। তাদের এই বক্তব্যে অনেক স্বাধিকার আন্দোলন কারীদের ধারনাই পালটে যায়। ১৯৭০ সালের দিকে থাকালে দেখব যে অনেক চীন সমর্থিত সংগঠন মাওয়ের গেরিলা সংগ্রামে জড়িত ছিলো। তারা কিন্তু আবার সোভিয়েতকে পছন্দ করতেন না । সময়ে সকল কিছুই বদলে দেয়”। (১০৬-১০৭)
আরোঃ
“ টুর্কিলঃ আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশ নীতি নিয়ে যা বলতে চাই – তা হলো এরা তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে অত্যন্ত শক্তিশালী ভাবে তাদের স্বাধিকার লড়াই সংগ্রামে সহায়তা দিয়েছে। সেই সকল দেশের প্রতি আমাদের কোন প্রকার সহানুভূতি নেই। তারা সেখানে তথাকথিত ‘প্রকৃত সমাজতন্ত্র’ একটি ‘গণতান্ত্রিক অর্থনীতি’ যার মানে হলো ‘জাতীয়করন’ করা, সামগ্রীক ভাবে যা দাঁড়ায় তা হলো রাস্ট্রীয় যন্ত্র হবে সকল কিছুর মালিক। অর্থাৎ রাষ্ট্র সকল উৎপাদন প্রক্রিয়ার মালিকানা অর্জন করবে। যাতে উৎপাদন ব্যবস্থার তেমন কোন পরিবর্তন আসবে না। সোভিয়েত ইউনিয়নের উৎপাদন পদ্বতী পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই মত অনেক ক্ষেত্রে তা এর চেয়ে ও খারাপ। সাবেক পূর্ব জার্মানীর ভল্কসিগেনার বেট্রিব কে দেখুন, যাকে তথা কথিত ‘জনগনের কোম্পানী’ বলা হয়। এখানে জনগন কোন দিনই ভাবেনি এটা তাদের কোম্পানী। বরং এরা ভেবেছেন এটা সরকারের কোম্পানী। জনগণ কিন্তু রাষ্ট্র নয়। পরিকল্পিত অর্থনীতি যা সোভিয়েতে এবং ইউরূপের কোন কোন দেশে চালু হয় তা কিন্তু কোন ভাবেই গণতান্ত্রিক নয় বরং মারাত্মক আমলাতান্ত্রিক। আর সেই জন্যই সোভিয়েত আমাদের জন্য মডেল হয়ে উঠতে পারে নাই। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন হলো আমাদের কৌশলগত বন্দু। আমাদের ভূলে গেলে চলবে না যে তা একটি পারমানবিক শক্তিশালী দেশ। স্বাধীকার আন্দোলনে এদের সমর্থন বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। ভিয়েতনাম যুদ্বে তাদের সমর্থন না পেলে ইতিহাস অন্যরকম হত। আন্তর্জাতিক শক্তির ভার্সাম্যের কারনেই সেদিন পৃথিবীর মানচিত্র এক ভিন্নরকম রূপ পায়”। (১০৫-১০৬)
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, তার আগে থেকেই সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীরা স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন তুলে নিতে থাকে । তারা সাম্রাজ্যবাদের সাথে দ্বন্দ্বের বিষয়টি চাপা দিয়ে তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে থাকে। এরা তাকে পূর্ব পশ্চিমের দ্বন্দ্ব সহ নানা অভিধায় অভিসিক্ত করতে থাকে । সোভিয়েত পতনের পর থেকে অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদের সামরিক শক্তি অধিক মাত্রায় উজ্জীবিত হয়ে উঠে। এরা তৃতীয় বিশ্বের উপর নানা ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে । প্রথম বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদি চক্রের মধ্যে একটা জোট গড়ে উঠে। ১৯৭০ সাল সাল থেকেই মাওবাদিগন, বিশেষ করে চীনের বাহিরের মাওবাদি সংগঠন সমূহ সোভিয়েতকে তাদের জন্য হুমকী হিসাবে দেখে আসছিলো। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত পতনে এরা উল্লষিত হয়ে উঠে। সেই সময়ে ও নানা জাগার স্বাধিকার আন্দোলন গুলো অসহায় হয়ে পড়ে। বহু জনপ্রিয় আন্দোলন সংগ্রাম শান্তি চুক্তির দিকে অগ্ররসর হতে বাধ্য হয়। সেই পরিস্থিতি অনেক মাওবাদি সত্যিকার ভাবে স্বীকার করতে চান না ।
জোটবদ্ব আন্দোলন প্রসংগ
সংগঠন হিসাবে জাতিয়তাবাদের প্রশ্নে এম-কে এ সঠিক ধারায়ই ছিলো। বিপ্লবীরা স্বাধীকার সংগ্রামকে একটি বিপ্লবের মধ্যবর্তী স্তর হিসাবে ভেবেছেন। এই সংগ্রামকে চূরান্ত হিসাবে দেখেন নাই। এটা ছিল সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পৌছানোর একটি কৌশল মাত্র। একেই ভাবে সাম্রজ্যবাদের পতন ও কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য নয় এটা হচ্ছে সাম্যবাদের উপনিত হবার পথ ও পন্থা মাত্র।
“টুর্কিলঃ আমরা সকল সময়েই চিন্তা করেছি যে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তি ছাড়া সাম্রাজ্যবাদের পতন সম্ভব নয়। প্রথমিক ভাবে আমরা সমাজতন্ত্র চাই। সাম্রাজ্যবাদের বিরুধীতা হলো করেই সমাজতন্ত্রের পথকে প্রসস্ত করতে হবে। কিন্তু এটা তেমন কাজ করছে না । তাই তা ও আমাদের নিকট অপ্রসংগীক হয়ে পড়ছে। এই কাজের নীতি হলো, ‘শত্রুর শত্রু আমাদের মিত্র’- একটি সাধারন নিয়ম- কিন্তু তা বিপদজনক”। (১৬৪)
“ শত্রুর শত্রু আমাদের মিত্র” এই নীতি সাধারনত জন জোট গঠনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সকলের সাধারন শত্রুর বিরুদ্বে একটি নির্দিস্ট লক্ষ্যে কাজ করার জন্য এই নীতির প্রয়োগ করা হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শত্রুরা বড় নিপীড়কের বিরুদ্বে লড়াই করতে তখন নিজেদের বিরুধ ভূলে যায়। রহস্যজনক ভাবে এম-কে এ সোভিয়েত ব্লকে ভিড়ার পর জোট থেকে সরে আসে। তারা ভাবতে থাকেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী আন্দোলনের অংশীদার। তারা সেই সময় ইরান ইরাকের সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী কার্যক্রমের প্রতি ও অনিহা প্রকাশ করে। “ ধর্ম ভিত্তিক প্রশাসন নিজেদেরকে সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী হিসাবে প্রকাশ করে কিন্তু তারা কাউকে মুক্তি দিতে পারেন না”। (১৬৪) এম- কে এ হামাস ব্যাতিত সকল ফিলিস্তিনী সংগঠনকে সাহায্য করেছিলো। ফিলিস্তিনীরা কেবল সোভিয়েত ব্লক নয় সেই সময় মধ্য প্রাচ্যের অনেক দেশ থেকে সহায়তা পেয়েছে। এমন কি বহু প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ও তাদের জন্য সাহায্য পাঠায় ।
“ শত্রুর শত্রু আমার বন্দু”- এই নীতি নিয়ে খুব বেশী দূর এগোনো যায় না । একটি রাজনৈতিক বিপ্লবের অনেক গুলো স্তর থাকে । কিছু সরাসরি আর কিছু থাকে একটু আড়ালে। তাই যখনই সত্যিকার ভাবে কোন সমাজ ব্যবস্থাকে বদল করতে উদ্যোগ নেয়া হয় তখন অনেক বন্দ্বু ও পিছু হঠে যায়। ফলে অনেক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শত্রু নির্বাচনে দেখতে হবে কে প্রধান শত্রু আর কে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির শত্রু। তাই জোট গঠন করতে গিয়ে অনেক কিছুই বিবেচনায় নিতে হয়। বিপ্লবীরা প্রায়স জোট গঠনের সময় অনেক কিছুর প্রতি উদাসীন থাকে। তবে, প্রয়োজনে ধর্মীয় দল গুলোকে ও জোটে নিতে আপত্তি নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে জোট কাদের জন্য ? জোট হবে আমাদের জন্য অন্যদের জন্য নয়। ইসলামিক ইরানের কথা মনে রাখতে হবে। সেখানে বাম পন্থীদেরকে হত্যা করা হয়েছে । সোভিয়েত তখন কিছুই বলে নাই। তখন ইরান প্রথম বিশ্ব, সাম্রাজ্যবাদ, ইজরায়েল, ও মধ্য প্রাচ্যের দেশ সমূহের সাথে বিরুধে লিপ্ত লিপ্ত ছিলো। সেই সময়ে অবশ্য চলছিলো সংশোধনবাদের চর্চা। ইরান নিজে সাম্রাজ্যবাদি না হলে ও আঞ্চলিক ভাবে নানা স্থানে নাক গলাতে শুরু করে। যেমন ফিলিস্তিনের হিজবুল্লাহদেরকে দিয়ে সেখানে ইজরাইল ও পশ্চিমাদের বিরুদ্বে কাজ করতে থাকে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন নানা দেশে বিপ্লবের স্বার্থে সাহায্য করেছে । বিপ্লবী কর্মকান্ডকে নিয়ন্ত্রন করেছে। যেমন – জিম্বাবুয়ে, লিবিয়া, ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশে নানা ভাবে বাম পন্থাকে সাহায্য করেছে। কিন্তু পরে জোট গত ভাবে বিপ্লবী ধারার কার্যক্রম স্থবির করে দেবার পর তারা আর সেই কাজে অগ্রসর হয়নি।
সামনে ও পিছনে দেখা
এম-কে এ এর বক্তব্যে জানা যায়ঃ
“টুর্কিলঃ মার্কসবাদ আদতে বিপ্লবের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদকে ও তাঁর শক্তিমত্তাকে উপেক্ষা করেছে বা তাকে ভালোভাবে বুঝতেই পারে নাই। মার্কসের সময় কালেই পুঁজিবাদের সংকটকে ‘চূড়ান্ত সংকট’ বলে অভিহিত করেছেন। অথচ ইহা কোন ভাবেই ১৯৭০ সালের চেয়ে কোন ভাবে ভিন্নতর ছিলো না ।
দ্বিতীয়ত, আমাদের মনে হয় সাম্রাজ্যবাদ যুদ্বকালিন অবস্থা থেকে আমাদের তুলনায় অনেক বেশী শিক্ষা গ্রহন করেছে। মার্কিন যুক্তরাস্ট্র ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দ্বন্দ্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের রনকৌশল বদল করেছে।
তৃতীয়ত, আমাদের মনে হয় আমরাও সমাজতান্ত্রিক উপাদান সমূহকে বেশী শক্তিশালী হিসাবে বিবেচনা করেছি। অনেক আন্দোলনই গভীর ভাবে জাতিয়তাবাদি ছিলো কিন্তু এরা সমাজতান্ত্রিক রঙ ব্যবহার করেছে। তবে এখানে ভুল বুঝার কোন অবকাশ নেইঃ আমরা সচেতন ভাবেই তাদেরকে গ্রহন করেছিলাম, তাদের সমাজতান্ত্রিক অবরন মিথ্যা ছিলো না, তবে তাঁর গভীরতা ছিলো খুবই কম । সমাজতন্ত্রের অঙ্গীকার হলো উন্নততর জীবন মান চিশ্চিত করা ও সুন্দর স্বপ্ন দেখানো। কিন্তু লড়াই সংগ্রামে এর প্রতিফল হয়নি। জাতীয়তাবাদি আন্দোলন গুলো সমাজতন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত হয়নি।
চতুর্থত, আমরা গভীর ভাবে বিশ্বাস করতাম আমাদের মক্তকরা জাতিগুলোতে ঐক্য স্থাপিত হবে, বৈশ্যিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা চালু হবে। কিন্তু তা বাস্তবে ঘটেনি।
পঞ্চমত, সোভিয়েত ইউনিয়ন একসময় ভাবত তাদের সকল বিরুধী শক্তি পরাজিত হবে, কৌশলগত কারনেই আমেরিকা ও তাঁর ক্ষমতা হারাবে কিন্তু যে যাই বলুক না কেন বাস্তবে তা ঘটে নাই”।(১৬২-১৬৩)
উক্ত বিষয়ে লিডিং লাইট সহমত পোষন করে। পুঁজিবাদ প্রমান করেছে যে, তার ঠিকে থাকার শক্তি কম নয়। এটাকে অবমূল্যান করা বুদ্বিমানের কাজ নয়। পুঁজিবাদ তাঁর নিপীড়ন কারী বিজ্ঞানকে উন্নত করেছে। তাই আমাদের উচিৎ মুক্তির বিজ্ঞানকে আরো এগিয়ে নেবার। বিশ্ব ব্যাপি সাম্রাজ্যবাদি শক্তি হিসাবে প্রথম বিশ্বের উত্থান ঘটেছে। পুঁজিবাদ এখন বৈশ্যিক রূপ ধারন করেছে। তাদেরকে প্রতিরোধের পথ ও পন্থা আমাদেরকেই উদ্ভাবন করতে হবে। ভবিষ্যত আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে ।

যাপাতিস্তা অথবা লিডিং লাইট ?
পরবর্তী আলোচনায় যাওয়ার আগে এম – কে এ এবং লিডিং লাইটের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত কিছু বক্তব্য আলোচিত হয়া দরকার। যদি আন্দোলন বিষয়ক প্রশ্ন করা হয় তবে বলা হয় প্রচলিত কার্যক্রম আগামী দিনের আন্দোলনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। মেক্সিকোর দক্ষিন অঞ্চলে যাপাতিস্তারা কাজ করেন আর লিডিং লাইট কাজ করে সারা বিশ্বেঃ
“টুর্কিলঃ আমাদের মনে হয় যাপাতিস্তা একটি ভিন্ন ধরনের উদাহরন সৃস্টি করতে পেরেছে। তারা একটি নবতর সমাজতান্ত্রিক ধারনার উদ্ভাবন করতে পেরেছেন । তারা সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী ভূমিকায় অবতির্ন হয়েছেন। তারা আন্দোলন সংগ্রামের ধরন ও প্রকৃতি বৈশ্যিক জাতিয়তাবাদি নয়।
আমরা এই প্রবনতা এখন অনেক আন্দলোনেই দেখতে পাচ্ছি, ব্যাক্তিগত মেধাসত্বের জন্য ‘ভিন্নমত্রার সংগ্রাম’ যুক্ত হচ্ছে। সেই সংগ্রাম এখন সরকারী ও বেসরকারী ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তা ছাড়া তারা তাদের দৈনিন্দিন জীবন যাত্রায় যক্ত করছেন ভালো মন্দের প্রশ্ন। তারা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছেন কোনটি ভালো আর কোন টি মন্দ? কোনটি সঠিক আর কোনটি বেঠিক? ইত্যাদি। যাপাতিস্তারা ক্ষুদ্র পরিসরে ও ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে কাজ করছেন। তবে প্রতিস্টানিক ভাবে ক্ষমতা কাঠামোতে অংশ গ্রহন নিচ্ছে না” । (১৭৪-১৭৫)
সত্যিকার অর্থে যাপাতিস্তারা জাতিয়তাবাদি নয়, আর মেক্সিকান জাতিয়তাবাদি তো নয়ই। তারা স্থানীয় ভাবে সমাজের সাথে গভীর সম্পর্ক রক্ষা করে কাজ করে থাকেন। তারা জগনের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করছেন। সাথে সাথে তারা আন্তর্জাতিক বিষয় সমূহ ও উপেক্ষা করছেন না । তারা দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে অনেক বৈশ্যিক প্রকৃতির। তবে, এখন ও তা প্রমানিত নয় যে সাম্রাজ্যবাদ বিরুধিতায় ও বিপ্লবে তারা কি ভূমিকা রাখতে পারবেন।
যাপাতিস্তাদের জাতিয় মুক্তি ফ্রন্ট এবং জাতিয় কংগ্রেস ১৯৯০ সালে জোরদার সংগ্রামের সূত্রপাত করেছিলো। যদি ও যাপাতিস্তারা বৈশ্যিক ভাবধারায় উজ্জিবিত কিন্তু নিম্ন স্তরের দিকে তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফল ঘটাতে পারেন নাই। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যখন যাপাতিস্তারা লড়াই সংগ্রামে বেশ অগ্রসর হয়েছে তখন তারা নিজেদের নানা প্রতিস্টানে মেক্সিকান ইমেজ উজ্জ্বল করার জন্য উদ্গ্রিব হয়ে পড়েন। এরা সামাজিক ভাবে চিয়াপাচ কেন্দ্রীক ভাবনায় আবিস্ট ছিলেন। তবে চিয়াপাচের বাহিরের লোকেরা সুস্যাল ডেমুক্রেটিক ভাবনা ও পাতি বুর্জোয়া চিন্তার ধারক ছিলেন বলেই এরা তাদের ঘোষিত আদর্শে ঠিকে থাকতে পারেন নাই । তারা পশ্চিমা ভাবধারায় ও উত্তর আমেরিকান ইউরূপীয় চিন্তায় ঝুকে পড়েন। তাদের টি –সার্টে চেগুয়েভারার ছবি শুভা পেতে থাকে । রা জন্ম দেয় নানা রোম্যান্টিকতার। যাপাতিস্তারা গনসংগ্রাম ও গনলড়াইয়ের অংশ হলে ও তারা সকল সময়েই সংশোধনবাদি চিন্তার ধারক ছিলেন। যাপাতিস্তারা ভিবিন্ন সময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাবার সুযোগ পেলে ও তা গ্রহন করে নাই। তারা সামাজিক গনতন্ত্র বা উদারতাবাদের জন্য মেক্সিকো ও বিদেশে এই ধারনা প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তারা সচেতন ভাবেই মার্কোসের ব্যাক্তি ইমেজ তৈরী ও বিপ্লবী রুম্যান্টিকতার বিকাশ ঘটায় । ১৯৯৬ সালে মার্কোস এক অভিনব ভূমিকায় অবতির্ন হন। তিনি সাম্রাজ্যবাদি ফ্রাঞ্চের ফার্স্ট লেডিকে এই মর্মে বার্তা দেন যে, “ ম্যাডাম, আমি একজন কাগুজে নয়ক তাই আমি আপনাকে একখানা কাগুজে গোলাপ পাঠালাম”। এরা কোন ভাবেই জন সংগ্রাম বা লড়াইয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাবার চেস্টা করে নাই। তারা আদর্শ হিসাবেই কেবল সাম্যবাদের প্রচার করতেন। সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী প্রচারনা ও তারা করতেন । যা একেবারেই বিজ্ঞান সম্মত নয়, বাস্তব ও নয়। এরা পুরাতন ক্ষমতা কাঠামোর বদলে নতুন ক্ষমতা কাঠামোর কোন উদ্যোগই গ্রহন করেন নাই।
সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যাপাতিস্তাদের বক্তব্যে তেমন কোন নতুত্বই ছিলো না । তারা আকাশী রঙয়ের সামাজিক গণতন্ত্র কায়েমের চেস্টা করছিলেন। মূখে পাইপ আর কবি কবি ভাব নিয়ে তারা এক উদাসীন দল গড়ে তুলার চেস্টা করেছেন। “ কেবল কবিতাই বিপ্লবের পথ হতে পারেনা”। যাপাতিস্তা আন্দোলন সৌখিন ও হিপ্পিদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। উত্তর আমেরিকা ও ইউরূপে তরুনদের মাঝে এক ধরনের নৈরাজ্যবাদি ভাবনার প্রসার ঘটায়। এই সকল কাজের মাধ্যমে আর যাই হোক কোন ভাবে সাম্যবাদ ও আসেবে না আর সাম্রাজ্যবাদের ও কোন পরিবর্তন আসতে পারে না ।
বিজ্ঞানের স্তর বিন্যাস
অনলাইনে কাজ করতে গিয়ে কে এ কে এবং এম – এ কে এর বেশ কিছু নথি আমাদের হাতে এসেছে। তা অধ্যয়ন করতে গিয়ে দেখছি। তাদের ধারনায় বিশ্ব বিশ্লেষন, সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী ভূমিকা এবং প্রথম বিশ্বে যারা বিপ্লবী কর্মে জড়িত তাদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্ব পূর্ন শিক্ষা বিদ্যমান আছে । তবে তা লিডিং লাইটের মত তেমন সমৃদ্ব বা উন্নত নয়। তা অনেকটাই প্রথমিক স্তরে অবস্থান করছে। যদি ও এম –কে এ প্রথম বিশ্বে উদ্ভাবিত হয়েছে কিন্তু এরা সারা দুনিয়ায় বিপ্লবী বিজ্ঞানকে সম্প্রসারিত করতে তেমন উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে নাই। লিডিং লাইট যে ভাবে সাম্যবাদিদের জন্য নিজেকে একটি ভ্যান গার্ড হিসাবে তৈরী করতে পেরেছে তেমনি তারা তেমন কোন ভূমিকা পালন করে নাই। তবে এরা ও তৃতীয় বিশ্বের লড়াই সংগ্রামকে সাহায্য সহযোগীতা করেছে। নানা দেশের স্বাধীকার আন্দোলন ও বিশেষ করে ফিলিস্তিনীদেরকে আর্থিক সাহায্য উল্লেখ করার মত । পক্ষান্তরে, লিডিং লাইট মনে করে আজকের দুনিয়ায় সমস্যা আরো গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। কেবল সাম্রাজ্যবাদ বিরুধীতার জন্য নয় বরং প্রশ্ন আসতেই পারে, “ আমাদেরকে কি করিতে হইবে?” তৃতীয় বিশ্বের শক্তি সামর্থই বা কি । বিশ্ব বিপ্লব এখন স্থির হয়ে পড়েছে। বিগত দিনের ঘটে যাওয়া বিপ্লব গুলোর পতন হয়ে গেছে। অতীতের কিকি আর অবশিষ্ট এখনো আছে। অনেক অনেক টাকা ই এই পরিস্থিতিকে পাল্টাতে পারবে না । এখন সময় হলো এই ধোঁয়াশা অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজে বেড় করা। পরবর্তী বিপ্লবের উপযুক্ত পথের উদ্ভাবন করা। এখন বিপ্লবের জন্য কি কি করতে হবে তা নিয়ে ভাবা দরকার। যেভাবে এই ধারনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মার্ক্স থেকে লেনিন এবং লেনিন থেকে মাও যে ভাবে বিকশিত হয়েছে সেই ভাবে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে । আমরা বিশ্বের নতুন ইতিহাস লিখতে চাই। তাই আমরা সকল বিপ্লবী শক্তিকে আহবান করি আসুন আমরা ইতিহাসে পরবর্তী অধ্যায়টি লিখি। সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসুন। এই বিশ্ব আমরাই জয় করতে পারি। অনুবাদঃ এড শিহাব।
Kuhn, Gabriel. Turning Money Into Rebellion (Kersplebedeb, 2014)

Turning Money into Rebellion edited by Gabriel Kuhn part 3

Advertisements