ট্রটস্কির “অনন্ত বিপ্লব” আসলে প্রতি বিপ্লব

ট্রটস্কির “অনন্ত বিপ্লব” আসলে প্রতি বিপ্লব

-জেকব ব্রাউন

ট্রটস্কির ইহধাম ত্যাগ করার প্রায় ৮০ বছর পর ও রিভিশনিস্ট চক্রের কাছে বেশ জন প্রিয় হয়ে আছেন। এর কারন হলো তিনি ছিলেন ভালো কথক, ভালো বক্তা এবং ভালো লিখক। তবে প্রায়োগিক ভাবে এসবের তেমন কোন মূল্য নেই। তার তত্ত্ব নিয়ে এখন ডজন খানেক দল উপদল গড়ে উঠেছে, যারা নিজেদেরকে ট্রটস্কিপন্থী বলে দাবী করছেন। আমরা এখানে তার তত্ত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে তার মিমাংশা করছি না বরং ঐতিহাসিক ভাবে তার রাজনৈতিক চিন্তা কর্ম কেমন ছিলো তার উপরই আলোকপাত করতে চাই।
ট্রটস্কি প্রচলিত পুজিবাদি-সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক হয়ে উঠেন, তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সামরিক কায়দার অনুসারী ছিলেন। ট্রটস্কির তত্ব ছিলো “অসম এবং সম্মিলিত উন্নয়ন” তিনি তার বিস্তারিত ব্যাখায় দাড় করিয়েছেন তার রিভিশনিস্ট ধারার পুস্তক “নিরন্তর বিপ্লব” নামক বইতে। ট্রটস্কি লিখেছেনঃ
“ আমরা যদি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদাহরন হিসাবে ভারত ও ব্রিটেনের হিসাব করি, তবে দেখতে পাব আন্তর্জাতিক জাতীয়তার প্রশ্নে দুইদেশের শ্রমিকগন একেই অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন না, তাদের কাজ ও কার্ম পদ্বতি ও এক নয়, তাঁরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। ভারতীয়দের স্বাধিকার আন্দোলনের সফলতা এবং ব্রিটেনে ও অপরাপর দেশ সমূহে বিপ্লবের সম্ভাবনা ছিলো। এখন ভারতে বা ব্রিটেনে কি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করে সমাজ গঠন করা সম্ভব ? তাঁরা সকলেই এখন এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁরা এই অবস্থায় মার্ক্সীয়ান আতন্তর্জাতিক- জাতিয়তাবাদ গঠন করতে এগিয়ে আসবে না”। (১)
ট্রটস্কি সাম্রাজ্যবাদি চক্রের শোষন মূলক সম্পর্কের কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন সাম্রাজ্যবাদি শোষক জাতি এবং উপনিবেশিক শোষিত ও নিপিড়িত জাতি। অন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাদেরকে কি ভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। ট্রটস্কি বলেছেন এরা “একে অন্যের উপর নির্ভশীল”।একে অন্যকে শোষণ করছে। অন্যান্য শোধনপন্থীরা তো তা স্বীকার ই করেন না । তবে ট্রটস্কি তা স্বীকার করেছেন । তবে অনেকের মত তিনি বিপরীত অবস্থানে থাকা জাতি সমূহকে ও তাদের মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্বের কথা এড়িয়ে গেছেন।
ট্রটস্কির ত্তত্ব ই গড়ে উঠেছে “নিরন্তন বিপ্লবের” নামে আর “প্রচলিত ও সম্মিলিত উন্নয়ন” কৌশলের উপর ভিত্তি করে। এই ধারাটি হলো সংশোধন পন্থার ধারা, জাত্যাভিমানের ধারা । সাম্রাজ্যবাদিরা এই ধারার বিকাশের জন্যই বুর্জোয়াদের মধ্যে কাজ করেন। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর “অগ্রসর” জাতির মধ্যে বিপ্লবের বিষয়টি মিথ্যা প্রামানিত হয়ে “অনগ্রসর” জাতি সমূহের মধ্যে প্রাথমিক ভাবে বিপ্লবের বিষয় টি স্পষ্ট হয়েছে।

সামাজিক জাত্যাভিমানী তত্ত্বের ধারকগন মনে করেন যে, “অগ্রসর” সাম্রাজ্যবাদি জাতি সমূহের মাঝে প্রথমে বিপ্লব সংগঠিত হলে তা দ্রুত অন্যান্য দেশে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়বে। তা সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে নতুন সমাজ গড়ে উঠবে। এখন ট্রটস্কিবাদিরা মনে করেন প্রথম বিশ্বের ধনিক শ্রেনী ও নয়া উপনিবেশিক শক্তির সহায়তা ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশ সমূহ নয়া ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে না ।
পক্ষান্তরে, বিশ্ব গন সংগ্রামের “নিরন্তর বিপ্লব” কৌশল এবং লিডিং লাইটের বিশ্ব জন লড়াইয়ের কৌশলের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। লিডিং লাইটের মতে, দুনিয়ার প্রলেতারিয়েত (তৃতীয় বিশ্বের) নয়া ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তুলবে। নয়া ক্ষমতা কাঠামো তাদের শক্তি তৃনমূলে বিস্তার করবে, নয়া “রাষ্ট্র মডেল” তৈরী করবে। লিডিং লাইট এশিয়া আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকায় সাধারন মানুষের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও শক্তির উন্মেষ গঠিয়ে পুরাতন ব্যবস্থার বিনাশ করে নতুন সমাজ বিনির্মানে এগিয়ে আসবেন।
আত্মবিশ্বাস ও স্বীয় সিদ্বান্ত গ্রহনের ক্ষমতা নতুন প্রতিস্টান তৈরীতে ভূমিকা রাখবে এবং গন মানুষের লড়াইয়ের শক্তি যোগাবে। এই শক্তি একে অন্যকে আরো ক্ষমতায়ন করবে। তা এক সময় গন জোয়ার সৃজন করে আমাদের সারা দুনিয়ায় লিডিং লাইটের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র কায়েম করবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রথম বিশ্বকে ঘেড়াও করা হবে এবং প্রাজিত করে প্রলেতারিয়েত বিপ্লব সাধন করা হবে।
আলোকিত সাম্যবাদিগন প্রতিবিপ্লবী ট্রটস্কিবাদিদের “নিরন্তর বিপ্লব” প্রচেস্টার অবসান করে তাদেরকে ও সত্যিকার বিপ্লবী ধারায় ফিরিয়ে আনবে। দুনিয়া জোড়ে যে মহা বিপ্লবের সূচনা হবে তাতে তাদেরকে ও শরিক করে বুর্জোয়া বিশ্বে বিপ্লব করা হবে তাতে তাদের শায় থাকুক বা না থাকুক। সাম্যবাদ কায়েমের ক্ষেত্রে কোন প্রকার আপোষের সুযোগ দেয়া হবে না । (২)
সংশোধনবাদীদের “নিরন্তর বিপ্লব” ধারনাটি প্রধানত আমাদের সামনে সেনা প্রশাসনের একটি চিত্র ও হাজির করে থাকে। লিয়ন ট্রটস্কির নেতৃত্ব প্রধানত রাশিয়ান গৃহ যুদ্বের সময় কালে নতুন সোভিয়েত ব্যবস্থার সময় বহাল ছিলো। তিনি তার নেতৃত্ব কোন ভাবেই কার্যকরী করতে পারতেন না যদি সেনা অফিসার, সৈনিক, লাল ফৌজ এবং জনতা সহায়তা না করতেন। ট্রটস্কি নিজেই সেনাদের মধ্য থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের কথা বলেছেন। ফলে জারের আমলের সাবেক আমলারাই রাজনৈতিক কর্মের উপর দাদাগিরি করার সুযোগ পেয়ে যায়। এই ধরনের নীতিকে বলা হয় “যুদ্বকালিন সাম্যবাদ” যা কৃষকেদর নিকট থেকে খাদ্য দ্রব্য রিকজিশন করে সংগ্রহ করে শহুরে শ্রমিকদের জন্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। (৩)
১৯২১ সালে রাশিয়ার গৃহ যুদ্বের সময় নানা জায়গায় বিদ্রোহ দেখা দেয়, এতে বহু বলশেভিক লোকেরা ও অংশ গ্রহন করেন। এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে রাস্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের চিত্র তোলে ধরে। একেই বলশেভিক নেতাগন “নয়া অর্থনৈতিক নীতি” বলে প্রচার করেন। যা প্রকৃত বিচারে ছিলো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। এই নীতির লক্ষ্য ছিলো যুদ্বকালিন সাম্যবাদকে মানুষের নিকট সহজ করে দেয়া। কিন্তু ট্রটস্কি বিদ্রোহকে নিমর্ম ভাবে দমন করার নীতি নিয়েছিলেন। নয়া নীতি জনগণের নিকট গ্রহন যগ্য হলে ও ট্রটস্কির পদক্ষেপ গ্রহন যোগ্য ছিলো না ।
১৯২১-১৯২৮ সালে নয়া নীতির অভিজ্ঞতা বিশ শতকে সাম্যবাদি আন্দোলনের ডানপন্থীরা স্থায়ী ভাবে বাস্তবায়নের উতসাহ পায়। তা নিকুলাই বোখারিন থেকে দেং জিয়াও পিং পর্যন্ত সকলেই পছন্দ করেন। কিন্তু ট্রটস্কি তা পছন্দ করেন নাই। ট্রটস্কি সকল সময়ই যুদ্ব কালিন সাম্যবাদের তত্ত্বকে প্রধান্য দিতে পছন্দ করতেন। ট্রটস্কি তার বিখ্যান গ্রন্থ “সন্ত্রাসবাদ এবং সাম্যবাদ” এ লিখেনঃ
“ আগের প্রতিটি সমাজেই প্রধানত সংখ্যা লগিস্টদের স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে, এবার রাষ্ট্র এমন সমাজ তৈরী করেছে যা সংখ্যা গরিস্ট মানুষের স্বার্থ সুরক্ষা করবে, এটা আমরাই বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম করছি যা সমাজের সকল মানুষের সম কল্যান সাধিত হবে । তবে এই কর্ম সহজে হবার নয়, তার জন্য দরকার নরম গরম সব রকম ব্যবস্থারই দরকার। রাস্ট্রীয় উপাদান থেকে এখন জবর দস্তির বিষয়টি এখন ও বিযক্ত হয় নাই, এখন ও তা কার্যকরী আছে, একটি গ্রহনযোগ্য মাত্রায়, নির্দিস্ট সময় পর্যন্ত তা বজায় রাখতে হবে”।
“ বাধ্যতা মূলক ভাবে শ্রম সেবা আদায় করতে হলে … সামরিক ব্যবস্থার আমল না করে তা বাস্তবায়ন অচিন্তনীয় ব্যাপার”।
“ আমরা কেন সামরিকি করনের কথা বলছি ? … এখন পর্যন্ত এমন কোন সংস্থা গড়ে উঠেনি যারা সাধান নাগরিকদেরকে গ্রহন যোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রন বা বিষেশ ধারায় পরিচালিত করতে পারে, একটি রাষ্ট্র প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব কায়েমের জন্য তাকে এই সামরিকি করনের পথে হাটা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। কেবল সেনবাহিনীই একটি জাতির জীবন মৃত্যুর প্রশ্নে, রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। আইন শৃংখলা বজায় রাখতে তাদের ভুমিকা সবিশেষ কার্যকরী”।(৪)
ট্রটস্কির “শ্রমের সামরিকিকরন” প্রক্রিয়া চীনের গন মুক্তি ফৌজের সাথে একেবারেই সংগতিপূর্ন ছিলো না। চীনের গন মুক্তি ফৌজের মূলবানী ছিলো “জনগণের সেবা করুন”। তা জনতার উপর ছাপিয়ে দেবার কোন বিষয় ছিলো না । পিএলএ মাওয়ের বিখ্যাত বানী, “ সমূদ্রে যেমন মাছ বিচরন করে, গেরিলারা ও জনগণের মাঝে সেই ভাবে বিচরন করবেন” যথাযত ভাবে মেনে চলতেন। তাঁরা নিজেদের সেনাবাহিনীকে জনগণের অংশ মনে করতেন”।
১৯৬০ সালের “ এক চল্লিশ” প্রচারনায়, এবং ১৯৬৪ সালের “পি এল এ থেকে শিক্ষা নিন” প্রচারনায় সাম্যবাদি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিষয়ে জনমত গঠনের জন্য জনতার মাঝে ব্যাপক প্রচার অভিযান চালানো হয়। (৫) পক্ষান্তরে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ট্রটস্কির নেতৃত্বে “এক ব্যাক্তির ব্যবস্থাপনা” এবং লাল ফৌজের সহায়তায় “শ্রমের সামরিকি করন” করা হয়। সত্যিকার অর্থে ট্রটস্কির লাইনে সমাজতন্ত্র কায়েমের কোন পথ নির্দেশনা ছিলো না । এটা অনেকটাই প্রথম বিশ্ববাদি ধারার “শ্রমিক বিপ্লবের” পন্থা ছাড়া আর কিছুই নয়। ট্রটস্কি প্রথা, অভ্যাস, “বিশেষজ্ঞ” , এবং পুজিবাদি-সাম্রাজ্যবাদের রীতিনীতি অনুসরন করেন। তিনি সাম্যবাদি পন্থার বাস্তবায়ন না করে ঐতিহ্যের নামে পুঁজিবাদের পথেই হাটেন।
লিংগগত দিক থেকে ট্রটস্কি, প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদি ধারা অনুসারী ছিলেন। তার অনুসরন কারীরা ও উদারতাবাদি ধারার বাস্তবায়নে উৎসাহিত ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় পর্নগ্রাফীর আশ্রয় প্রশ্রয় দেন। তিনি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় যৌন কর্মে “স্থায়ী চাকুরী” প্রদানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। (৬) আলোকিত সাম্যবাদিগন কোন ভাবেই দেহ ব্যবসার প্রশ্রয় দিবে না । দেহকে পন্য হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে না । বরং নিরাপদ যৌন কর্মের সুব্যবস্থা করবে। সেখানে নারী ও শিশুদের জন্য পুর্ন স্বাধিনতা ও মুক্তির গ্যারান্টি নিশ্চিত করা হবে ।
ট্রটস্কির চিন্তা ধারাকে সামগ্রিক ভাবে চবিচার করলে তা একটি সংশোধনবাদি ধারা হিসাবেই চিহ্নিত করা যায়। তিনি তার কার্যধারাকে “শ্রমের সামরিকিকরন” হিসাবে বর্ননা করার প্রয়াস পেছেন। মানুষের সাথে শ্রমের সম্পর্ক বিষয়ে তার ভাষ্য হলোঃ
“ সাধারন মানুষ কাজ করতে চায় না। কাজকে ভালোবাসা নিয়ে মানুষ জন্মায় না, এটা তার চরিত্র নয়ঃ এটা তার আর্থিক প্রয়োজনে এবং সামাজিক শিক্ষার কারনে অভ্যস্থ হয়ে উঠে। বলা যায়, মানুষ হলো একটি অলস প্রাণী। এই গুনাবলী ও যোগ্যতাকে লালন করলে মানব প্রগতি থেমে যাবে; কারন মানুষ যদি কাজ না করে তবে আর্থিক, সাংকৃতিক ভাবে এবং প্রকৌশলগত ভাবে এগিয়ে যাবার কোন পথ থাকবে না । কেউ কেউ হয়ত আবার একে প্রগতি শীলতা ও বলতে পারেন এই কারনে যে এরা অনেক সৃজনশীল কাজ ও করে থাকে”।(৭)
পক্ষান্তরে, কার্ল মার্ক্স মানুষের সাথে কাজের সম্পর্ক বিষয়ে যে কথা বলেছেন তা হলো এই রূপঃ
“ মানুষ একটি প্রাণী হিসাবে পৃথিবীকে কাজের ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচনা করে, ইতিমধ্যে সে নিজেকে একটি কাজ পাগল প্রচাতি হিসাবে প্রমান করেছে। তার উৎপাদনই বলে দিচ্ছে সে একটি সক্রিয় প্রাণী। তার উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে প্রকৃতিকে পরিবর্তন করছে। মানুষ কাজ করে তার বুদ্বিমত্ত্বাকে কাজে লাগিয়ে নয়া পরিস্থিতির সৃজন করেন। প্রকৃতিকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। সে উৎপাদন কারী প্রাণী হিসাবে অন্যান্য প্রানীকে ও কাজে লাগায় …
মানুষ তার শ্রম দিয়ে প্রকৃতি ও বুদ্বিবৃত্তিক ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটায়। সে সামাজিক, শারিরিক ও মানবিক পরিস্থিরির উন্নয়ন সাধন করে থাকে”। (৮)
কার্ল মার্ক্স এবং “বড় মার্ক্সবাদি” লিয়ন ট্রটস্কি নাটকীয় ভাবে পরস্পরের বিপরীত ! উদাহরন হিসাবে বলা যায় যে মার্ক্স যেখানে বলেছেন, মানুষ হলো কর্ম মূখী “উৎপাদন কারী প্রাণী” অন্য দিকে ট্রটস্কি বলেছেন মানুষ হলো অলস কর্ম বিমূখ প্রাণী। মার্ক্স মত দিয়েছেন এই বলে যে যখন কোন মানুষ কাজ করে উপযুক্ত মূল্য পায় না তখনই তার মাঝে দেখা দেয় বিচ্ছিন্নতা বোধ। অর্থাৎ এলিনেশন। অন্য দিকে ট্রটস্কি এই এলিনেশনকে মানুষের প্রকৃতি হিসাবে দেখার প্রয়াস পেছেন। তিনি মুলত মার্ক্সবাদের মুল সূত্র থেকে দূরে সরে গেছেন।
ট্রটস্কি মানুষের শ্রম দানের ইচ্ছাকে বাতিল করেছেন এই মর্মে যে, “ জন্মগত ভাবে মানুষ কাজ করতে পছন্দ করে না … তিনি বলতে চেয়েছেন মানুষ জাতিটাই হলো অলস”। আমাদের অবাক হবার কিছু নেই যে, তিনি রাজনৈতিক ভাবে গন সংগ্রামের পথ গ্রহন করে ও রাজনীতিকে কম্যান্ড হিসাবে বিবেচনায় নিয়েছেন, আর জনতার সেবার জন্য প্রতিস্টান গড়েছেন। তিনি শ্রম শক্তিকে সামরিকি করনের পথে নিয়ে গেছেন। সত্যিকারে সাম্যবাদি বা আলোকিত সাম্যবাদি গন মানুষকে সেবার ব্যবস্থা করেছে। আর ভূয়া “সাম্যবাদি” গন তাদের “নিজস্ব স্বার্থে” জনগণকে কাজে লাগিয়েছে।
তাই বলতেই হয় “ মার্ক্সের দিকে ফিরে আসুন” সংস্কার পন্থীদের এই আহবান ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নেই। ট্রটস্কির মত অনেক ভূয়া মার্ক্সবাদিই কেবল “মূলের দিকে ফিরুন” এই আহবান করে থাকেন। অথচ মার্ক্সের শ্রম তত্ত্ব বা মৌলিক শিক্ষার দিকে এদের তেমন কোন নজর নেই। এরা প্রধানত মার্কসের ‘বিচ্ছিনতাবোধ’* তত্ত্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এরা একুশতকের সামাজিক শ্রেনী বিন্যাসের কোন চিন্তা ভাবনাই করেন বলে মনে হয় না। “মার্কসবাদে ফিরে আসুন” তত্ত্বের অন্দ্বভক্তদের মত আলোকিত সাম্যবাদিগন কাজ করেন না । বরং মার্ক্সীয় সমাজ বিজ্ঞানের পথ ধরে এগিয়ে চলেন। (৯)
আলোকিত সাম্যবাদিগন প্রচলিত ধারার সমাজ বিশ্লেষণের চেয়ে ভিন্ন ভাবে উৎপাদন মাধ্যমকে দেখে থাকেন। চলমান দুনিয়ায় সমভাবে সম্পদ বন্ঠনের দৃস্টিকোন থেকে প্রলেতারিয়েত শ্রেনী সত্যিকার অর্থে কেমন আছেন। (১০) এবং মার্ক্সের তত্ত্ব ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ একুশ শতকের আগে শ্রমিক শ্রেনীর মাঝে শিল্প ভিত্তিক সমাজে কেমন প্রভাব ফেলত বা “বিশ্ব বস্তিতে” মানুষের অবস্থান কেমন তা বিবেচনায় নিয়ে লড়াই সংগ্রামের পথ রচনা করে থাকেন।
ট্রটস্কিবাদ যেখানে উৎপাদন ব্যবস্থার তত্ত্বকে সামনে তুলে ধরতে চাইছে সেখানে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ- মাওবাদ(মাওবাদ-তৃতীয় বিশ্ববাদ) সহ সকলে মিলে ও তাদেরকে মোকাবেলা করতে পারবে না । লেনিনবাদি ধারার লোকেরা ও পুরাতন ধারা চিন্তা ভাবনা থেকে মুক্ত নন। যেমন “ প্রলেতারিয়েতের ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এক ব্যক্তির ব্যবস্থাপনা” তত্ত্বকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন। তবে মাওবাদিরা তাদের আধর্শিক চেতনার ফলে ট্রটস্কি পন্থার খন্ডন করে দেখিয়ে দিয়েছেন । (১১) তবে এখন চীনাদের সামনে উতপাদনবাদ ভাংগার জন্য অনেক কাজ বাকী, প্রথম বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে উন্নয়নের উল্লম্পন ঘটানোর স্বাক্ষ্য তাদের হাতেই প্রমানিত হচ্ছে।
মৌলিক ভাবে উতপাদনবাদ হলো একটি সংস্কারবাদ। বুঝানো হয় যে যা হচ্ছে তা সঠিকই হচ্ছে “ গাড়ী তার দুই চাকায় ভর দিয়েই চলছে” সাথে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়। উৎপাদনের কথা শুনানো হয়। কিন্তু এটা তো সত্যি যে প্রথম বিশ্বকে এরা কোন ভাবেই ধরতে পারবেন না । কেননা প্রথম বিশ্ব যে লুন্ঠন করে তা সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ায় করে না । তৃতীয় বিশ্ব কেবল তখনই প্রথম বিশ্বকে “ধরতে পারবে” যখন তাঁরা প্রথম বিশ্বকে ঘেরাও করে পরাজিত করতে সক্ষম হবে !(১২) উতপাদনবাদ কিন্তু কোন ভাবেই সমাধান নয়। ১৯৭০ সাল থেকেই মাওবাদি রাজনৈতিক ধারা “ট্রটস্কিবাদের” বিরুধিতা করে আসছে। চীনের ভেতর ও এর বাইরে সমগ্র দুনিয়ায়। কিন্তু এখন কিছু চিনা তাত্ত্বিক ট্রটস্কিবাদের ধারা ভাবছেন আর প্রথম বিশ্বের সাথে পাল্লা দেবার জন্য কাজ করছেন। (১৩)
আমরা যদি “দ্বিতীয় আরো একটি পন্থার” কথা চিন্তা করি তখন ও সেখব যে, লিন পিয়াংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সাথে ট্রটস্কির চিন্তা ধারা কোন মিল নেই, তাই আমরা তার সম্পর্কে আর অধিক কিছু উল্লেখ করতে আগ্রহী নই। ১৯৭১ সালের সাম্যবাদি বিপ্লবের অনুশীলন ছিলো উৎপাদন শক্তি অতিক্রমের একটি প্রচেষ্টা। (১৪) এই সামগ্রিক প্রচেস্টার উদ্দেশ্য ছিলো সকল অনুশীলনের ভূল ত্রুটি সমূহ সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
সাধারন ভাবে বলতে গেলে বলতে হয় লিন পিয়াংয়ের সাম্যবাদ ছিলো কিছুটা “ব্যারাক সমাজতন্ত্র” অন্যদিকে ট্রটস্কির সমাজতন্ত্র ছিলো সামরিক তন্ত্র দিয়ে প্রভাবিত। কিন্তু আলোকিত সাম্যবাদের ধারনায় তার স্থান নেই। তাঁরা মনে করেন “মাওবাদ-তৃতীয় বিশ্ববাদ” সংশোধনবাদ যেমন ট্রটস্কিবাদকে প্রতিরোধ করতে পারবে না । তাই ফ্রেইরী ফায়ার লিখেনঃ
“ আমি লিন পিয়াংয়ের উত্থান চাই। আমি স্বীকার করি তিনি “ব্যারাক সাম্যবাদ” কায়েমের চেষ্টা করেন। আমি এর পর ও লিনের অনুশীলন কে প্রসংশা করি। তার সাংস্কৃতিক বিপ্লব সামাজিক পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমি মাওবাদি লাল বাহিনীর সাক্ষাৎকার শোনেছি। তাদের কথায় বোঝা যায় যে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ সালে চীণের তরুন সমাজ ব্যাপক ভাবে জেগে উঠে ছিলো। চৌ এন লাই নিজে ও তাদের সমর্থক ছিলেন। এরা সঠিক পন্থায় এগোতে পারলে সাম্যবাদের ফলা ফল আরো ভালো হত”।
“… হ্যা সেই উত্থান এক নতুন শক্তির বিকাশ ঘটায় এবং জনগণের স্বাধীন বাহিনী গড়ে উঠে, পুলিশ সেখানে নানা ভাবে বাঁধা হয়ে উঠে, তাঁরা নানা ভাবে ভূল বার্তা প্রচার করে। সত্যিকার নেতৃত্বের অভাবে সেই উত্থানের কাজ টি যথাযথ ভাবে সম্পাদিত হতে পারে নাই । ফলে কিছু নির্মম ঘটনা ও ঘটে যায়। মাওবাদিরা কাঠামোগত ভাবে পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে, প্রতি বিপ্লবের প্রতিরোধ করতে এগিয়ে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারে নাই। কেননা তাঁরা নতুন চিন্তার বদলে পুরাতন পন্থার অনুসরন করছিলেন । ফলে দুনিয়ার মানুষের আশায় ছাই পড়ে যায়। ব্যার্থ হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব”।(১৫)
পরিশেষে কথা হল, “নিরন্তর বিপ্লবের” যে ধারনা ট্রটস্কি হাজির করেন তা প্রতিবিপ্লবেরই চিত্র। ট্রটস্কি পন্থার অপসারণের জন্য আলোকিত সাম্যবাদ অনুসরন করা উচিৎ। যদি আমরা বিপ্লবের নতুন ঢেউ তুলতে চাই তবে এর কোন বিকল্প নেই । কমরেড প্রেইরী ফায়ারের মতে, “ বিপ্লবের এক মাত্র পথ হলো লিডিং লাইট কমিউজম !”

Notes:
1. Leon Trotsky, “The Permanent Revolution” (https://archive.org/stream/permanentrevolut035092mbp/permanentrevolut035092mbp_djvu.txt)
2. PF, “Is Peoples’s War universal?” (http://llco.org/is-peoples-war-universal)
3. John G. Wright, “Trotsky and the Red Army” (https://www.marxists.org/history/etol/writers/wright/1941/10/redarmy.htm)
4. Leon Trotsky, “Terrorism and Communism”, Chapter 8 (https://www.marxists.org/archive/trotsky/1920/terrcomm/ch08.htm)
5. PF, “Lin Biao as Barometer”, (http://llco.org/lin-biao-as-barometer)
6. Spartacist League (http://www.icl-fi.org/english/esp/58/conference.html)
7. Leon Trotsky, “Terrorism and Communism”, Chapter 8
8. Karl Marx, “Estranged Labour” (https://www.marxists.org/archive/marx/works/1844/manuscripts/labour.htm)
9. Shah Alam, “Communist Revolution Universal”
10. PF, “Revisiting Value and Exploitation” (http://llco.org/revisiting-value-and-exploitation)
11. Kao Hung, “From Bernstein to Liu Shao-chi” (http://marxistphilosophy.org/BernLiu.pdf)
12. PF, “On counter-revolution: Just pointing to revisionists is not enough” (http://llco.org/on-counter-revolution-just-pointing-to-revisionists-is-not-enough)
13. PF, “Who and What are Trotsky-cons?” (http://llco.org/who-and-what-are-trotsky-cons)
14. PF, “Lin Biao as Barometer”
15. PF, “On counter-revolution: Just pointing to revisionists is not enough”

Advertisements