লিডিং লাইট কমিউনিজম এবং আন্তোনিয় গ্রামসির লিখনিঃ ১/৩- সাংস্কৃতিক আধিপত্য

লিডিং লাইট কমিউনিজম এবং আন্তোনিয় গ্রামসির লিখনিঃ ১/সাংস্কৃতিক আধিপত্য

জেকব ব্রাউন

ইতালীয়ান চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসির ভাষ্য মতে, বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো “সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ”আধুনিক দুনিয়ার “প্রথম” বিশ্বের বুর্জোয়া শ্রেনীর লোকেরা এখন কেবল রাষ্ট্রীয় নির্মম সন্ত্রাস নয় বরং এরা সাংস্কৃতিক ও চিন্তাধারাগত দিক গুলো ব্যবহার করে রাজত্ব করছেন। বুর্জোয়া বিশ্ব তাদের সেনা শক্তির পাশা পাশি তাঁরা তাদের ভাড়াটিয়া রাজনৈতিক নেতা, দল, ও চক্রের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টি ভঙ্গী, রীতিনীতি, এবং আদর্শ ও অন্যান্য সমাজের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত। কার্ল মার্ক্স লিখে ছিলেন, “ শাসক শ্রেনী তাদের শাসন কালে নিজেদের ভাবধারা, চিন্তা চেতনা ও বুদ্বিবৃত্তিক বিষয়াদি সমাজে সংক্রমিত করে চলে”()

তৃতীয় বিশ্বের” সাধারন মানুষ প্রতিদিনকার জীবনের পরতে পরতে বুর্জোয়া বিশ্বের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের চাপের সম্মোখিন হচ্ছে। এক সময় বুর্জোয়া বিশ্ব কেবল বন্দুকের নলের মুখে দুর্বল দেশ সমূহের উপর প্রভূত্ব কায়েম করে কান্ত হত। কিন্তু এখন এরা আরো অগ্রসর হয়ে সাধারন মানুষের উপর সাংস্কক্রিতিক আগ্রাসন ও চালু করেছে । আজ বুর্জোয়া বিশ্ব বুঝতে পারছে যে তৃতীয় বিশ্বের উপর প্রভূত্ব কায়েম করে তা বজায় রাখার জন্য সামরিক আধিপত্যের পাশা পাশি সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা কালচারাল হেজিমনি ও বজায় রাখার দরকার। তাই তাঁরা নানা ভাবে মিথ্যা অজুহাতে “ভূয়া সচেতনতা” সৃজনে কাজ করছে। জনগণের মধ্যে এমন ধারনা তৈরীর প্রায়স চালাচ্ছে যে, তাঁরা ভাবতে বাধ্য হবে যা ঘটছে তাই “স্বাভাবিক” । এতে কোন শোষণ বা বঞ্চনার বিষয় নেই। সোজা কথা তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র মানুষ মনেই করবে না যে, তাদের ঐক্যবদ্ব ভাবে স্বাধীকার অর্জনের জন্য আলোকিত সাম্যবাদের দিকে এগিয়ে যাওয়া দরকার।

আন্তোনিও গ্রামসী তার জেলখানার নোট বইয়ে বিষয় টি এই ভাবে ব্যাখ্যা করেছেনঃ

১। জনগণের একটি বড় অংশ “ক্রমাগত” ভাবে প্রভাবিত হতেই থাকবে, যারা সমাজের ক্ষমতাশালী গুষ্টির লোক; “ঐতিহাসিক” ভাবে বিশ্ব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এদের একটি সম্মানজনক অবস্থা বিরাজমান। এরা অন্য দিকে সামাজিকভাবে প্রতিপত্তিশালী ও বটে।

২। রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের লোকেরা “আইনের” দোহাই দিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার নামে নানা ভাবে চাপ ও শক্তি প্রয়োগ করে থাকে। রাস্ট্রের এই কর্মের প্রতি জনগণের “মতামত” আছে কি নেই তার কোন তোয়াক্ষাই করা হয় না। চাপ প্রয়োগ কারী সংস্থা সামাজিক সংকট নিরসনের নামে যা করে চলে তাতে জনগণের মতামত নেবার দরকার ও মনে করে না …()

গ্রামসির সময়টিকে ঐতিহাসিক দৃষ্টি কোন থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, তিনি উৎপাদন শক্তি তত্ত্ব ও অর্থনীতিবাদকে বিরুধিতা করেছেন। সাদা সিদা মার্কা অর্থনীতিবাদ মুলত মানুষের সামগ্রিক মুক্তির জন্য সাম্যবাদের লড়াই সংগ্রামকে পিছিয়ে দেয়। লেনিনের মতই গ্রামসি ও শ্রমজিবী দরিদ্র মানুষ তিব্র লড়াইয়ের মাধ্যমে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য এগিয়ে আসার আহবান করেন। তিনি সেই লড়াইকে পরিবর্তনের যুদ্বনাম দিয়ে বলেছেন সেই লড়াই পরিচালিত হবে কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে। লেনিন ও গ্রামসী উভয়ই কমিউনিস্ট ভ্যান গার্ড হিসাবে পদাধিকারের লড়াই চালনায় সাংস্কৃতিক লড়াই ও লড়তে বলেছেন। () আমরা গ্রামসির চিন্তাধারার বাহিরে ও মাওয়ের চিনে এইরূপ লড়াইয়ের একটা নমুনা দেখতে পাই। সেই লড়াই চীনের গৃহ যুদ্ব এবং মহা সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সময়ে ও দেখতে পাওয়া যায় ।()

সংস্কারপন্থী, সামাজিক গনতন্ত্রী, এবং অন্যান্য আধুনিক সংশোধনবাদি শক্তির কার্যক্রমে গ্রামসির চিন্তা চেতনার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়, তাঁরা তাদের সকল বিপ্লবী কার্যক্রমে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় রেখেছেন।() তাঁরা ক্রমান্বয়ে বুর্জোয়া সমাজের উপরি কাঠামোতে প্রচলিত সাংস্কৃতিক প্রভাব বলয়কে বিতারিত করে নয়া ধারার সৃজন করতে চায়। তবে সংস্কারবাদিরা আলোকিত সাম্যবাদের মৌলিক কার্যক্রমের সাথে একাত্ম নন। তাঁরা পুরাতন ব্যবস্থার বিপরিতে নয়া ব্যবস্থার প্রবর্তনে উৎসাহিত নন।

সংস্কারবাদিরা গ্রামসির চিন্তাধারার অপব্যবহার করছেন, এরা প্রলেতারিয়েত বিশ্ব ও পুঁজিবাদী বিশ্বের পার্থক্য নিরূপনে অনাগ্রহী। ফলে এরা দুনিয়ার সংখ্যা গরিস্ট মানুষের ক্ষতি সাধনে লিপ্ত রয়েছে। তাঁরা বলতে চায় যে, এখনও দুনিয়া গ্রামসীর সময়ে মতই আছে। আধুনিক সংস্কার পন্থীদের একটি অংশ মনে করেন যে, গ্রামসি ও মাওসেতুং দুনিয়াকে ভাগ করেন নাই । সংস্কারবাদিদের মত প্রথম বিশ্বের “বিপ্লবীরা” এবং জনরঞ্জনবাদি “বাম্পন্থীরা” বিশ্বাস করেন ক্রমান্বয়ে প্রথম বিশ্বের নেতৃত্ব তাঁরা ও গ্রহন করতে পারবেন। এই সামাজিক আভিজাত্যবাদি চক্র মনে করেন, “প্রলেতারিয়েত শ্রেনী আত্ম রক্ষামূলক লড়াইয়ের দরকার নেই”। অথচ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদি সংশোধন পন্থীদের দমন করতে না পারলে সকল চেষ্টাই বৃথা যাবে।()

সংস্কারপন্থী বা সংশোধনবাদিদের মত নয় বরং সত্যিকার বিপ্লবী শক্তি এখন লিডিং লাইটের আওতায় সংঘবদ্ব! আমরা আলোকিত সাম্যবাদের আওতায় নয়া ক্ষমতার উন্মেষ ঘটাতে চাই। সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী নয়া ক্ষমতা কাঠামোর বিকাশ ঘটিয়ে নয়া নেতৃত্বের পথ সুগম করতে চাই। আলোকিত সাম্যবাদের আলোকে “ ক্ষুদ্র পরিসরে” প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র বিনির্মান করে বিশ্ব ব্যাপী গন সংগ্রামের মাধ্যমে স্থানীয় বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদের চরদেরকে বিতারিত করে দুনিয়াময় সমাজ বিপ্লব সাধন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতি আধ্যিপত্য কায়েম করতে হবে। সামগ্রিক ভাবে মানব জাতির মুক্তির জন্য পরিপূর্ন বিপ্লবের কোন বিকল্প নেই।

Notes:

1. Karl Marx, “The German Ideology”, Volume 1 / Chapter 1 / Part B
2. Antonio Gramsci, “Selections from Prison Notebooks: The Intellectuals”
3. Antonio Gramsci, “Selections from Prison Notebooks: State and Civil Society”
4.
http://llco.org/two-roads-defeated-part-3-proletarian-jacobins/
5.
http://isj.org.uk/gramsci-versus-eurocommunism/
6.
http://www.nuovopci.it/eile/en/gramsci_prpw.html

Advertisements