এন্থোনিও গ্রামসির “জেকবিন প্রিন্স” এবং লিডিং লাইট সাম্যবাদ- জেকব ব্রাউন পার্বঃ ২/৩ ঃ লিডিং লাইট ও এন্থোনিও গ্রাসির চিন্তাধারা

গ্রীক পৌরানিক কাহিনীতে, মানুষ কিভাবে আগুন পেল সেই সম্পর্কে একটি গল্প চালু আছে । প্রমিথিউস টাইটান দেবালয় থেকে মানব জাতির জন্য আগুন চুরি করে আনে। প্রমিথিউস একটি পাত্র নিয়ে দেবরাজ অলিম্পাসের গৃহে যায় এবং সেখান থেকে একটি অগ্নি খন্ড চুরি করে নিয়ে আসেন। সেই অগ্নি পাত্রটি তিনি মানব জাতিকে উপহার দেন। সেই অগ্নি পাত্র পেয়ে মানব জাতি স্বধীকারে স্বাধ পায়। তাঁরা দেবালয়ের প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ করে। প্রমিথিউস মানব জাতির পক্ষ নেয় এবং তাদেরকে স্বশাসিত হতে সাহায্য করেন। দেবরাজ অলিম্পাস সেই জন্য প্রমিথিউসকে শাস্তি দেনঃ

“ প্রমিথিউস একজন বিদ্রোহীঃ
তাকে পাথরের সাথে পেরেক মেরে আটকে দাও, পাহাড়ের চূড়ায় বেঁধে রাখ
শিকল দিয়ে মুড়িয়ে তাকে শক্ত করে বাঁধ
সে তোমাদের সম্পদের খাজানা লুন্ঠন ও চুরি করেছে
সে আগুনের মাধ্যমে সকল কিছু মানুষকে দিয়ে দিয়েছে – সে অপরাধি
দেবতারা তা মেনে নিতে পারে না, আর সেই জন্য তাকে শাস্তি ভোগ করতেই হবে”।(১)

পৌরানিক কাহিনী অনুসারে, দেবরাজ অপরাধী প্রমিথিউসের কলিজা খাওয়ার জন্য একটি ইগল পাখি পাঠায়। টাইটান একজন অমর দেবতা হিসাবে মারা যায় না বরং প্রতিরাতেই তার কলিজা আবার প্রতিস্থাপিত হয়। দিনের পর দিন প্রতিদিন ইগল পাখী প্রমিথিউসের কলিজা খেতেই থাকে। তবে যাই হোক, প্রমিথিউস সফল কাম হয়েছেন, তিনি মানব জাতিকে স্বাধিকার দিয়েছেন দেবতাদের শাসন আর শোষণ থেকে। অনেক দিন পর জিউসের এক পুত্র সন্তান হিরাক্লিস প্রমিথিউসের নিকট আসেন আর থাকে মুক্ত করেন এবং ইগল পাখিকে হত্যা করেন।

১৯০১ সালে “এখন কি করিতে হইবে?” নামক পুস্তকে লেনিন বলেন, বুর্জোয়া ভাবধারার বাহিরে গিয়ে প্রাগরসর কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে বিপ্লবী বিজ্ঞানের অবতারনা করতে হবে। (২) “প্রিজন নোটবুকে” এন্থোনিও গ্রামসি আমাদেরকে দেখিয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টি হলো নিকোলো ম্যাকিয়াভিলীর “প্রিন্সের” মত ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু জ্যাকোবিনগন হলো সংরক্ষণ পন্থী চক্র। জ্যাকোবিনরা চায় বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক প্রভাব ক্রমে কমিয়ে এনে প্রলেতারিয়েত সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল সৃজন করতে বা হেজমনি তৈরি করতে। গ্রামসি ম্যাকিয়াভিলির “দি প্রিন্স” আলোচনা করে লিখেছেনঃ
“ ম্যাকিয়াভিলি তার দি প্রিন্স নামক পুস্তকে বলেছেন, একটি নতুন রাষ্ট্র পেলে কি ভাবে কেমন করে প্রিন্স হিসাবে পরিচালনা করতে হয়; তার বক্তব্যে প্রবল যুক্তি আছে, তাতে বিজ্ঞান না ও থাকতে পারে। উপসংহারে ম্যাকিয়াভিলি বলেছেন, জনতার সাথে মিশে যাওয়া, জনতায় পরিনত হওয়া; কিন্তু কোন ভাবেই সাধারনে পরিনত হওয়া নয়, তাদেরকে তাদের মতই থাকতে দিন, ম্যাকিয়াভেলি বিগত দিনের অভিজ্ঞার আলোকেই কথা বলেছেন- সচেতন জনতার কথা, তাদের পরিচয় ও প্রকাশ ভঙ্গীকে মূল্যায়ন করতে দিন”।(৩)

গ্রামসি মুলত পৌরানিক কাহিনি গুলোকে প্রতিক হিসাবে নিয়ে ভ্যানগার্ড তথা কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা এবং ম্যাকিয়াভিলির প্রিন্সের ব্যাখ্যায় জ্যাকবিনদের প্রাথমিক ভূমিকার কথা বলতে চেয়েছেন। বুর্জোয়া বিশ্ব এখন যেভাবে আধিপত্য বজায় রেখেছে তা থেকে প্রলেতারিয়েত বিশ্বকে মুক্তি পেতে হলে বিপ্লবী বিজ্ঞানের চর্চা আবশ্যক। লিডিং লাইট বর্তমান বুর্জোয়া বিশ্বের নিকট গ্রীক পৌরানিক কাহিনীর প্রমিথিউসের মত। যারা প্রলেতারিয়েতের নিকট বিপ্লবী বিজ্ঞান সঞ্চালন করছে, এই তাদের মাঝে বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে সংগঠিত করে বুর্জোয়া বিশ্বের বিরুদ্বে নয়া বিপ্লবের সূচনা করবে। প্রমিথিউসের মত লিডিং লাইট কমিউনিস্টগন ও বুর্জোয়া সমাজেই একেই রকমের পরিস্থিতির সম্মোখিন হচ্ছে। বুর্জোয়া বিশ্বে কেহ কেহ প্রলেতারিয়েতদেরকে ক্ষমতায়ন করতে গিয়ে নিজেরা জেল, জুলুম ও নিপিড়নের শিকার হচ্ছেন। আমাদের কমরেড ও সহযোদ্বাগন নিজেদের আত্মত্যাগ করে যাচ্ছেন কেবল প্রলেতারিয়েতদের মুক্তির লড়াইকে বাস্তবায়ন করতে।

বুর্জোয়া বুদ্বিজিবীগন কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে জনগণের সাথে একাত্ম হন । অন্যদিকে প্রলেতারিয়েতের ভেতর থেকেই “প্রাকৃতিক বুদ্বিজীবীগন” গড়ে উঠেন। গ্রামসি বলেন, প্রাকৃতিক বুদ্বিজিবীগন সমাজে প্রলেতারিয়ান সাংস্কৃতির আধিপত্য বিস্তারে ভূমিকা রেখে থাকেন। প্রাকৃতিক বুদ্বিজিবীদের জ্ঞান ও অনুশীলন “আনুস্টানিক ভাবে গড়ে উঠা বুদ্বিজিবী” সমাজের তুলনায় বুর্জোয়া বিশ্বে অধিকতর কার্যকরী ও সৃজনশীল। ফলে জনগনের মাঝে প্রাচীন ধ্যান ধারনা, ধর্মীয় ভাবধারা, ও কুসংস্কার নিয়ে নেতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করে থাকে। ফলে তা সামাজিক বিপ্লবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। জনগণ সহজেই পুরাতন ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে এগিয়ে আসতে পারেন।

তথাকথিত “উপনিবেশবাদ উত্তর” চিন্তক গন গ্রামসীর চিন্তা ও ভাবধারা এবং বিপ্লবী বিজ্ঞান থেকে “সাব অলটার্ন” বা নিম্ন শ্রনীভূক্ত লোকদের ভূমিকাকে বাদ দেবার প্রয়াস পেয়েছেন। (৪) আলোকিত সাম্যবাদের ধারনাকে ও বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছেন। তাঁরা বিজ্ঞান ভিত্তিক ভাবে দুনিয়ার ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে যে বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান স্বীকার করতে চায় না (সাব অলটার্নদের ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য), চলমান এই দুইটি শ্রেনীর মাঝে চলছে বৈরী বিরোধ। অথচ “অভিজাত প্রতিনিধি” গন কিভাবে সাব অলটার্নদের মাঝে কাজ করবে তা ও স্পষ্ট নয়। বর্তমান বস্তুগত অবস্থায় “উপনিবেশবাদ উত্তর” পরিস্থিতিতে ভূমিকা কি হওয়া উচিৎ তা নিয়ে লিখেছেন জর্জ সুরেলঃ

“ একটি প্রকৃত অধ্যয়ন আদর্শিক পৌরানিকতা থেকে আমাদেরকে বেড় হয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে, তা হোক একটি পার্টি বা ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক। এটা সত্য যে ট্রেড ইউনিয়নের কাজে একটি সম্মিলিত প্রায়স লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পৌরানিকতার ধারনা থেকে বেড়িয়ে এসে সাংগঠনিক পরিমন্ডলে একটি যৌথ ব্যবস্থার বিকাশ সূচিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের বড় অর্জন হলো সাধারন ও সর্বাত্মক হরতাল পালন করার ক্ষমতা অর্জন করা। উদাহরন হল “ পেসিভ কার্যক্রম”, যাকে বলা যায় নেতিবাচক পদক্ষেপ ( সকলেই সচেতন ভাবে সম্মিলিত উদ্যোগে কর্ম বিরতি) পালন করা। অতএব এই সকল কাজের জন্য দুইটি বিষয় দরকার আর তা হলোঃ পৌরানিকতা ও তার সমালোচনা । “ প্রতিটি প্রাক পরিকল্পনায় কল্পলোক বা প্রতিক্রিয়াশীলতার” বিতারন। বাম পন্থার অযৌক্তিকতার প্রত্যাখ্যান, সুযোগের ব্যবহার, ( বুর্জোয়াদের মতই নাচোর বান্দা হিসাবে “মওকার তালাশ” করা) এবং ক্রমাগত চেষ্টায় রত হওয়া। (৫)

আলোকিত সাম্যবাদি জৈববুদ্বিজীবীগন পৌরানিক চরিত্র হারকিউলিসের মতই ভূমিকা পালন করে যাবে, তাঁরা জনগণের মাঝে কাজ করে তাদেরকে নিয়ে পুরাতন শক্তির বিনাশ সাধন করে প্রমিথিউসের মত রাজ শক্তি ছিনিয়ে আনবে। আর এটাই হবে আগামীদের সাম্যবাদি নেতাদের মূল কাজ। তাঁরা প্রমিথিউসের মত মানবজাতিকে আগুন এনে দেবার জন্য নিজের জীবন কোরবানী করে দিবে। মোটকথা হলো হার্কিউলিস হলেন একজন নায়ক, যিনি সকল বাঁধা অতিক্রমের ক্ষমতা রাখেন। যিনি বিপ্লবী বিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নেন ।

প্রলেতারিয়ান বিশ্বে লিডিং লাইটের জৈব নেতৃত্ব হলো হলো নয়া সামাজিক শক্তি, উর্বর ভূমিতে লিডিং লাইট সেই নেতৃত্ব সৃজন করবে। সেই জৈব নেতৃত্ব লিডিং লাটকে পরিচালনা করবে, জনগণকে সামনে বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নিবে, পুরাতন শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করবে, একেই ভাবে নয়া ক্ষমতা কাঠামো বিনির্মানের পথ রচনা করবে। বুর্জোয়া বুদ্বিজীবীরা বিপ্লবী বিজ্ঞান জনগনের লড়াই সংগ্রামের জন্য কিছুই সহায়তা দিতে চায় না বা সংহতি ও প্রকাশ করে না। পক্ষান্তরে, প্রলেতারিয়েত লিডিং লাইট বুদ্বিজীবীগন জনতার উত্থানকে উৎসাহিত করে সহায়তা দেয় এবং সং হতি প্রকাশ করে। (৬) সারা দুনিয়ার বিপ্লবী কর্মের জন্য সামগ্রিক ভাবে এরা কাজ করে চলে। তাঁরা বিশ্ব বিপ্লবী কর্মের কেন্দ্রে কাজ করে । তবে কিছু কিছু বুর্জোয়া লিডিং লাইট ও সেই সময়ে যোগদান করে থাকেন। একটি পূর্নাংগ বিপ্লবের জন্য এদের ভূমিকাকে আমারা স্বাগত জানাই!
আমাদের বিপ্লবী লাইন সঠিক, আমাদের নেতৃত্ব দক্ষ, একুশ শতকের উপযোগী কাজের জন্য আমাদের গতিশীল পার্টি আছে। আমাদের লং মার্চে যোগদিন, মানব মক্তির কাফেলাকে শক্তিশালী করুন! আলোকিত সাম্যবাদ আমাদের পথের দিশা । শিহাব।

Notes:
1. Aeschylus, “Prometheus Bound”
2. V.I. Lenin, “What Is To Be Done?”
3. Antonio Gramsci, “Selections from Prison Notebooks: The Modern Prince”, p. 319
4. Marcus Green, “Gramsci Cannot Speak: Presentations and Interpretations of Gramsci’s Concept of the Subaltern”
5. Antonio Gramsci, “Selections from Prison Notebooks: The Modern Prince”, p. 319-320
6. Mao Zedong, “Quotations from Chairman Mao Zedong”, Chapter 11: The Mass Li

Advertisements